ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮

বঙ্গবন্ধু ১০০ বাংলাদেশ ৫০

মাসুদা ভাট্টি | প্রকাশিত: ২৩ মার্চ ২০২১ ০৩:০৪; আপডেট: ২৪ জুন ২০২১ ০৬:৫৪

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশ স্বাধীন করেন, একটি স্বাধীন জাতির জন্ম দেন, তখন তার বয়স মাত্র পঞ্চাশ বছর। ১৯৪৮ সালে যখন তিনি ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন অস্তিত্ব দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে শুরু করেন তখন তার বয়স ত্রিশের কোঠাও পেরোয়নি। ভাবতে নিশ্চয়ই অবাক লাগার কথা যে, এরপর থেকে এই মানুষটি আর সংসার করেছেন কিংবা শান্তিময় পারিবারিক জীবনযাপন করেছেন বলে আমরা প্রমাণ পাই না। পঞ্চান্ন বছরের জীবনে ১৩ বছরেরও অধিককাল তিনি কাটিয়েছেন জেলখানায়। তার মানে পঞ্চান্ন বছরের ক্ষুদ্র জীবনে তিনি বাইরে ছিলেন ৩৭ বছর মাত্র। এই ৩৭ বছরের থেকে আমরা যদি শৈশব ও কৈশোরকালটি বাদ দেই, তার মানে যদি ১৮ বছর থেকে একজন মানুষের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কালপর্বটি ধরা হয় তাহলে মাত্র ১৯ বছরকাল সময় তিনি প্রকৃতপক্ষে কাজ করতে পেরেছেন। এবং এই ঊনিশ বছরে তিনি একটি স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করে, একটি জাতিকে নবজন্ম দিয়ে বাঙালি হিসেবে তার একটি আত্মপরিচয় দিয়ে, একটি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’কে সুদৃঢ় ও সক্ষম একটি অর্থনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ নামটিকে তিনি ‘হাইলাইট’ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর বিনিময়ে তাকে বাঙালি কী দিয়েছে? শিশুসন্তানসহ সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা এবং জীবৎকালে মিথ্যা সমালোচনা এবং মৃত্যু-পরবর্তীকালে নোংরা ও বিকৃত অপবাদ। গত ১৭ই মার্চ ছিল মহান মানুষটির শততম জন্মবার্ষিকী।

বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকীর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের বয়স হলো ৫০ বছর। কারণ, ৫০ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন। এই পথ খুব সহজ ছিল না, সে কথা আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়েও খানিকটা উপলব্ধি করা যায়। সেটা কীভাবে সে কথায় পরে আসছি। তার আগে এ কথা বলে নিতে চাই যে, বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালে যে সত্য উপলব্ধি করেছিলেন যে, পাকিস্তানের সঙ্গে আসলে একীভূত হয়ে টেকা যাবে না। কারণ, এই ভারত ভাগের ভেতর দিয়ে যে দু’টি রাষ্ট্রের জন্ম হলো, তারমধ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সর্বার্থেই অদ্ভূত। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান হলেও বিপুল সংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বীর বাস এই পাকিস্তানে। ভারতে বিপুল সংখ্যক মুসলমানের বসবাস হলেও সে দেশটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে যে সংবিধানটি গ্রহণ করতে সক্ষম হয় তা মূলত সেক্যুলার অর্থাৎ সর্বধর্ম সমন্বয়ের। আর পাকিস্তানে দ্রুততম সময়ে একটি সংবিধান প্রণয়ন তো দূরের কথা, স্বাধীনতার মাত্র বছরখানেকের মাথায়ই গণতন্ত্রকে নড়বড়ে করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। কথিত আছে যে, পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ্কে প্রকারান্তরে হত্যাই করা হয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে মূলত ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল ষড়যন্ত্র করে। এমনকি এতকাল পরে এসেও পাকিস্তান একটি সর্বসম্মত সংবিধান প্রণয়ন করতে পারেনি, এখনও দেশটিতে কথায় কথায় রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নেয় সেনা বাহিনী এবং কোনও নির্বাচিত সরকারপ্রধানই সে দেশে মেয়াদ পূরণ করতে পারে না বলে কথা রয়েছে। এই পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের নিগঢ় ভেঙে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটিকে আলাদা একটি জাতি পরিচয়ের ভিত্তিতে স্বাধীন করা যে চাট্টিখানি কথা নয়, তার প্রমাণ আমরা পাই মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষকে হত্যা এবং দুই লক্ষ নারীকে ধর্ষণের ঘটনার ভেতর দিয়ে। কতটা ভয়ংকর এবং নিষ্ঠুর হতে পারলে মাত্র নয় মাসে এত মানুষকে হত্যা করতে পারে একটি সেনাবাহিনী, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলেছিল প্রায় ছয় বছরকাল, বছরের হিসাবে সেই যুদ্ধেও বাংলাদেশের তুলনায় কম মানুষ মারা গেছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ছিল বহুপাক্ষিক, আর বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল মূলত একপাক্ষিক, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল এক্ষেত্রে মূল শত্রু এবং তাদের দেশীয় দোসররা ছিল তাদের একমাত্র সঙ্গী। মার্চে আক্রমণ শুরু হওয়ার প্রায় আট মাস পরে ভারত এই যুদ্ধের একটি অংশ হয়ে ওঠে বটে, কিন্তু তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পাকিস্তানের পক্ষে যারা ছিল তাদের মধ্যে অনেকেই এখন যেচেপড়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইলেও সে সময়ের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এরকম সম্পূর্ণ বৈরী পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা যে একমাত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল, এ কথা আজ সকল গবেষকই স্বীকার করেন। আর কারও পক্ষেই বিভক্ত বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভবপর ছিল না।

মোটকথা, ভাষা আন্দোলনের সময়কাল থেকেই আমরা এই বিভক্তির লক্ষণ দেখতে পাই। তারও আগে পাকিস্তান আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু নিজে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করলেও অতি দ্রুত তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, কত বড় ভুলের ঘটনা ঘটে গেছে কিন্তু পাকিস্তানের বাস্তবতা মেনে নিয়েই পাকিস্তানের নিগড়ে থেকেই নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের হাত থেকে বাঙালিকে নিষ্কৃতি দিতে চেয়েছিলেন। সে জন্য অপেক্ষা করেছেন, নেতৃত্বগুণে সকলকে একত্রিত করেছেন, কৌশল প্রণয়ন করেছেন এবং একজন রাজনীতিবিদ হয়েও রণকৌশল নির্ধারণে তিনি যেকোনও বিখ্যাত সামরিক নেতাকেও হার মানিয়েছেন, হয়ে উঠেছেন ‘জেনারেল পাবলিক’-এর ‘জেনারেল’। আর স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়ন থেকে আন্তর্জাতিক ভাবে ‘বাস্কেট কেইস’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া রাষ্ট্রের জন্য সামষ্টিক অর্থনীতি প্রণয়ন ছিল আরও দুরূহ এবং কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বঙ্গবন্ধু সেটিও সফলভাবে করে দেখাতে পেরেছিলেন স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মাথায়। আমরা ভুলে যাই যে, বঙ্গবন্ধু এই রাষ্ট্র ও তার জনগণকে একদম নিজের মতো করেই চিনতেন এবং বুঝতেন। সেই সময়ে বৈশ্বিক ট্রেন্ডকে মাথায় রেখে তিনি যে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন তা একটি ভগ্নপ্রায়, বিভক্ত রাষ্ট্রের জন্য সর্বৈক উপযুক্ত ছিল তা পরবর্তীতে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের শাসকদ্বয় আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। দুঃখজনক সত্য হলো, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিশেষ করে পশ্চিমা বিরোধিতা তথা আন্তর্জাতিক কূট-রাজনীতি ততটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। তার কারণ হিসেবে আমরা অনেক কিছুই চিহ্নিত করতে পারলেও মূলত দু’টি বিষয়কে আমরা প্রাধান্য দিতে পারি।
 

এক. পুবের সঙ্গে পশ্চিমা বাণিজ্যের জন্য চীনের বাইরে সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ার মতো দু’টি দ্বীপরাষ্ট্র যার একটির ভেতর দিয়ে আবার দুই পৃথিবীকে সংযোগকারী একটি প্রণালি চলে গিয়েছে সেটির প্রয়োজনীয়তা এবং, দুই. রাজনৈতিকভাবে সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া দু’টি দেশ বাংলাদেশের মতো এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, অন্ততপক্ষে পশ্চিমের কাছে। এছাড়া একই সঙ্গে একথাও সত্য যে, এই দু’টি দেশেই ধর্ম-পরিচয়টা এতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, যতটা এখন গুরুত্বপূর্ণ, এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা তখনও চরম এক বাস্তবতা ছিল, এখনও যা তেমনই আছে। ভারত উপমহাদেশে আরেকটি মুসলিম-প্রধান রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা তথাকথিত মুসলিম বিশ্ব কোনোদিনই উপলব্ধি করেনি আর পশ্চিম বাঙালি মুসলমানকে পাকিস্তানের বর্ধিত অংশ বলেই মনে করেছে। কিন্তু এই টানাপড়েনে বঙ্গবন্ধু বৈশ্বিকভাবে বাঙালিকে যে পরিচয় এনে দিতে সফল হয়েছিলেন সে পরিচয়ে এখন আর বাঙালি মুসলমান না থাকলেও পাকিস্তানের নিগড় থেকে বের হওয়ার জন্য বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়টি তৎকালীন উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোর জন্য বাংলাদেশ ও বাঙালিকে সমর্থন দেওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। না হলে ভারতসহ সোভিয়েত পরাশক্তির সমর্থন সে সময় আর কোনোভাবেই আনা সম্ভব হতো বলে মনে করার কোনও কারণ আছে কি? নেই। আর এই দুই রাষ্ট্রের সমর্থন না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন কতটা সম্ভবপর হতো সে প্রশ্ন নিয়ে বেশি এগোনোর কিছুই নেই, আমরা শুধু উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানে বালুচ এবং সিন্ধিদের কথাই বলতে পারি। স্বাধীনতা তারাও চায়, জোরালোভাবেই চায় কিন্তু এ পর্যন্ত এই দুই জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীনতার পক্ষে কোনও রাষ্ট্রকে কথা বলতে শোনা যায়নি, কোনোদিন যাবে বলেও মনে হয় না। অথচ পাকিস্তানে সামরিক বেসামরিক সকল সরকারই এই দুই জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছাকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করে চলেছে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই।

আজকে পাকিস্তান থেকে প্রায়ই আওয়াজ ওঠে ‘হামে বাংলাদেশ বানা দো’ (আমাদের বাংলাদেশ বানিয়ে দাও)– দুঃখজনক সত্য হলো, এই আওয়াজও আসলে ক্ষোভ থেকেই, বাংলাদেশকে ভালোবেসে নয়। এর কারণ আর কিছুই নয়, পাকিস্তান থেকে মাত্র ৫০ বছর আগে বাংলাদেশ আলাদা হয়েছে, এই ৫০ বছরে পাকিস্তান যা করে দেখাতে পারেনি, বাংলাদেশ তাই-ই করে দেখিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সামনে বাধার পাহাড় পাকিস্তানের তুলনায় কোনও অংশেই কম ছিল না। আকারে বড় দেশ পাকিস্তান, প্রাকৃতিক সম্পদে বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তান সমৃদ্ধশালী, কেবল তাই-ই নয়, পঞ্চাশ বছর আগে যে বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাঙালিকে বঞ্চিত করে পশ্চিম পাকিস্তানে হয়েছিল তার প্রায় পুরো অর্থায়নই হয়েছিল বাঙালির টাকায়। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় খুব সহজেই ‘বাস্কেট কেইস’ আখ্যা দিতে পেরেছিল। অপরদিকে পাকিস্তান বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে আর নিজের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বাংলাদেশের অর্থায়ন ছিল বলেই ইসলামাবাদ কিংবা পিন্ডির মতো এরকম আধুনিক শহর নির্মাণ করতে পেরেছিল কিন্তু তারপর এই পঞ্চাশ বছরে পাকিস্তানে দ্বিতীয় কোনও নগর পত্তন হয়েছে বলে নজির নেই। সর্বসম্প্রতি গাওয়াদর বন্দরকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক করিডোর পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক শিরোনামে নিয়ে আসছে বারবার তা মূলত চীনের ভারতবিরোধী অর্থায়ন এবং এই বিশাল চৈনিক বিনিয়োগ যে পাকিস্তানকে একটি দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত করতে যাচ্ছে সে বিশ্লেষণ অর্থনীতির যেকোনও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম খুললেই চোখে পড়বে। যেকোনও সূচকেই পাকিস্তানের চেয়ে কয়েক কদম এগিয়ে বাংলাদেশ– এই সত্য পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ, গবেষক কিংবা চিন্তকদের পক্ষে হজম করা কঠিন, ফলে তারা হতাশ হয়েই বারবার বলছেন যে, তাদের যেন বাংলাদেশ বানিয়ে দেওয়া হয়। এটা অক্ষমের ফাঁকা বুলি। কারণ, গত পঞ্চাশ বছরে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি আর কিছু না পারুক সে দেশের জনগণকে পুরোপুরি অক্ষম এক প্রপঞ্চে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে।

সেটা কী করে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশেরও কী শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়ে পরবর্তী কিস্তিতে  সুবর্ণজয়ন্তীর বিশেষ আয়োজনের কলাম বিভাগে আলোচনা করার আগ্রহ রাখি।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

masuda.bhatti@gmail.com




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top