ঢাকা শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

ক্লাস-পরীক্ষা ভুলতে বসেছে শিক্ষার্থীরা!

আবদুল হাই তুহিন | প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৫৮; আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২১ ১৫:১১

দিনদিন করোনার প্রকোপ বেড়েই চলেছে। সারাদেশে চলছে দ্বিতীয় দফায় ‘কঠোর’ লকডাউন। প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র বিরাজ করছে উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ। গত ১৩ মাস হতে চললো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এরই মধ্যে বাসায় বসেই কেটেছে শিক্ষার্থীদের ১ শিক্ষাবর্ষ। কবে শেষ হবে এ মহামারি? কবে খুলবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান? এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোন জবাব নেই কারোর কাছেই। দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতায় এক ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সারাদিন-রাত বাসায় থেকে শিক্ষার্থীদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট গেমসের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। স্মার্টফোনের প্রভাবে অনেক শিক্ষার্থী ব্লু ফিল্ম, টিকটক, লাইকিসহ নানা নিষিদ্ধ অ্যাপসের দিকে ঝুঁকছে। এতে নষ্ট হচ্ছে নৈতিকতা, কমে যাচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। এদিকে, সন্তানদের নিয়ে মহাটেনশনে দিনাতিপাত করছে অভিভাবকরাও।
 
সংক্রমণ এড়াতে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এদিকে দফায় দফায় বাড়ানো হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সময়। অনলাইনে বা টেলিভিশনে বিকল্প শিক্ষাদানের চেষ্টা হলেও তাতে সাফল্য এসেছে খুব কমই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় কোনো ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হয়নি এ সময়ে। ফলে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রতি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অটোপাস দিয়ে পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ করা হয়। আর উচ্চশিক্ষায় তো সেশনজটের কবলেই রয়েই গেছে।
 
 
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা, আড্ডা, গল্প সবই হতো রুটিন মাফিক অথচ করোনা তচনছ করে দিয়েছে তাদের একাডেমিক ক্যালেন্ডার। দীর্ঘ ১ বছর ১ মাসেও হয়নি কোন ক্লাস ও পরীক্ষা। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীরা যেন তাদের ক্লাস-পরীক্ষা ভুলতে বসেছে!  
 
 
জানতে চাইলে বিশিষ্ট সমাজ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নেহাল করিম দৈনিক সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়ালেখায় একটা অনীহা চলে এসেছে। তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ক্লাস ও পরীক্ষা না থাকায় তারা তাদের সহপাঠীদের সঙ্গে মিশতে পারছে না। ফলে তাদের মধ্যে একঘেয়েমি একটা ভাব চলে এসেছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত খেলার মাঠও নেই যেখানে তারা সময় কাটাবে। এমতাবস্থায় তারা মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের এ ভঙ্গুর অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিকল্প নেই বলে মনে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের এই অধ্যাপক।
 
 
তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বন্ধ এমনটা মানতে নারাজ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক । তিনি দৈনিক সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, শিক্ষার্থীদের উচিত তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া। কারণ তাদের সামনে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কেবল পাস করার জন্যই লেখাপড়া নয়। তাদের অবশ্যই জ্ঞানার্জন করতে হবে। শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট ও নিষিদ্ধ অনেক গেমসে ঢু মারছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষার এ কর্তাব্যক্তি বলেন, অবশ্যই সন্তান কি করে না করে সেদিকে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। নজরদারি বাড়াতে হবে। অন্যথায় সন্তান বিপথগামী হওয়ার শঙ্কা থাকবে।    
 
গত ১৩ মাসে প্রায় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী মারামারি, খুন, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে বিগো লাইভ, টিকটক ও লাইকি নামের অ্যাপ বন্ধ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সচিব, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সচিব, তথ্য মন্ত্রণালয় সচিব এবং বিটিআরসি’র চেয়ারম্যানকে এ নোটিশ পাঠানো হয়। গত বছরের ৮ অক্টোবর রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশটি পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জে আর খাঁন রবিন।
নোটিশের বিষয়ে আইনজীবী জে আর খাঁন বলেন, এসব অ্যাপের ব্যবহার তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী করছে। তরুণ ও কিশোররা গ্যাংয়ে জড়িয়ে অপরাধমূলক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে, হয়ে উঠছে সহিংস। এই অ্যাপসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চায় এবং নিজেকে জনপ্রিয় ভাবতে শুরু করে।
 
বিগো-লাইভ অ্যাপের মাধ্যমে তরুণ ও যুবকদের টার্গেট করে লাইভে এসে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি ও কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দিয়ে এবং যৌনতার ফাঁদে ফেলে কৌশলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এই অ্যাপের ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে ভারত ও পাকিস্তান এই অ্যাপটি নিষিদ্ধ করেছে। টিকটকের মাধ্যমে অনেক কিশোর-তরুণ উদ্ভট রঙে চুল রাঙিয়ে এবং ভিনদেশি অপসংস্কৃতি অনুসরণ করে ভিডিও তৈরি করছে, যাতে সহিংস ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট থাকে। উদ্বেগজনক যে এ টিকটক ভিডিওগুলোতে নেই কোনও শিক্ষণীয় বার্তা। উল্টো এসব ভিডিওর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা চলে যাচ্ছে। বিব্রতকর, অনৈতিক ও পর্নোগ্রাফিকে উৎসাহিত করায় ইতোমধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় এগুলোর ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
 
দি আইডিয়াল একাডেমির ক্ষুদে শিক্ষার্থী ফারদিন শাহরিয়ার অর্ক বলেন, অধৈর্য্য হয়ে যাচ্ছি। আর কতোদিন স্কুল বন্ধ থাকবো। বাসা থেকেও একটু বাইরে যেতে পারিনা? আর ভালো লাগছে না বাসায় থাকতে? আমরা স্কুলে যেতে চাই।
মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফারহান শাহরিয়ার অপি বলেন, বাসায় থাকতে আর কতো ভাল লাগে। গেমস খেলে সময় পার করি। বাইরে বেরুতে পারিনা। দীর্ঘদিন বন্ধু বান্ধবদের সাথে দেখা ও কথা হয়না। মনটা বিষাদে ভরে  গেছে। আমরা অবিলম্বে ক্লাসে ফিরতে চাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী বলেন, আমার বিশ্ববিদ্যালয় লাইফের সেমিস্টারই শুরু হয়েছে অনলাইনে। ক্যাম্পাসের আমেজ কি তা এখনো আমার অজানা। তাই আমি চাই যতদ্রুত সম্ভব বিশ্ববিদ্যালয় খুলুক। সে তার ক্লাসের কার্যক্রম স্বশরীরে উপভোগ করতে চান।   
ইডেন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জেরিন হাছান কান্তা বলেন, দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে যেতে পারিনা। বন্ধুবান্ধবদের সাথে দেখা হয়না। ভাল লাগে না। আমরা ক্যাম্পাসে যেতে চাই।
 
৪র্থ শ্রেণীতে পড়–য়া এক শিক্ষার্থীর মা বলেন, এক বছর ধরে স্কুলে যেতে পারছে না তার মেয়ে। ফলে এই শিক্ষাবর্ষের অনেক কিছুর সাথে পরিচিত না হয়েই তাকে পরবর্তী ক্লাসে উঠতে হচ্ছে। স্কুলের যে একটা সার্বিক পরিবেশ। অনেকগুলো বাচ্চার সঙ্গে মেশা ও শেখা। এখন বাসায় পড়ানোর চেষ্টা করলেও দেখা যায় তার আগ্রহ নেই। পরীক্ষা হচ্ছে না অনেক দিন ধরে। পরীক্ষা কিভাবে হয় সেটাই আসলে তার মনে নেই। পড়ার যে আগ্রহ সেটা অনেকটাই কমে গেছে। এমনকি তার আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। আমরা অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবি জানাচ্ছি।
এ প্রসঙ্গে সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা দৈনিক সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, সবকিছুই চলছে। কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খুললে শিক্ষার্থীরা অনেক যোজন যোজন পিছিয়ে পড়বে। যা ভবিষ্যৎ জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
 
প্রসঙ্গত, করোনা পরিস্থিতি অনুকূলে না এলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘সরকার যখনই স্কুলগুলো খোলার বিষয়ে চিন্তা শুরু করল, তখনই করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ এল। কাজেই আমাদের ছেলেমেয়েদের কথা চিন্তা করেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না খোলার সিদ্ধান্ত নেই।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top