ঢাকা সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮

জুমা: মুসলিম উম্মার সাপ্তাহিক মিলন উৎসব

মাহমুদ আবদুল্লাহ | প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৪৩; আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০২:৫৪

একজন মুসলিমের জীবনে সপ্তাহের প্রতিটি দিন সমান নয়। অন্যদিনগুলোতে মুসলিমরা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যস্ত থাকলেও জুমার দিনটি আমাদের জীবনে আলাদা একটি বার্তা নিয়ে আসে। এই দিনটি হয়ে ওঠে সারা সপ্তাহের ইবাদতে নতুন প্রাণ নিয়ে আসার উপলক্ষ। আমরা কুরআনের বানীতে ও রাসুলে কারিম (সা.) এর হাদিসেও একই ধারণার সমর্থন পাই।

যেমন, আল্লাহ তায়ালা সুরা জুমুআতে উল্লেখ করেন, ‘মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন নামাজের আজান দেওয়া হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে ত্বরা করো এবং বেচাকেনা বন্ধ করো।’ (সুরা জুমুআ, ১০) এছাড়া রাসুল (সা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে অথবা রাতে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহ তাকে কবরের পরীক্ষা থেকে রক্ষা করবেন।’ (সুনানুত তিরমিজি)

এছাড়া আরও অন্যান্য হাদিস দ্বারা এটি প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে জুমার দিনটির একটি বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে। আমরা এই লেখায় সেগুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ভাবে জানতে চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

জুমার নামকরণ
আরবিতে জুমা (জুমআ) শব্দটি এসেছে ‘জামাআহ’ বা দল থেকে। যেহেতু এইদিনটিতে মুসলিমগণ ইবাদতের জন্য দূরদুরান্ত থেকে একত্রিত হতেন তাই একে জুমা বা সমাবেশের দিন বলে আখ্যায়িত করা হয়। রাসুল (সা.) মদিনায় হিজরতের পর যখন নিয়মতান্ত্রিক জুমা আদায় করা শুরু হলো তখন থেকে মুসলিমরা সপ্তাহের এই দিনটিকে এ নামে অভিহিত করেন। যদিও এই দিনে একত্রিত হওয়া ইতিহাসে কোনও নতুন ঘটনা নয়।

জুমার ইতিহাস
সুপ্রাচীনকাল থেকেই সকল ইলাহী ধর্মে সপ্তাহে একটি দিন নির্দিষ্ট থাকত, যে দিনটিতে মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন থেকে বেরিয়ে নিজেরা একত্রিত হবে, সম্মিলিত ভাবে ইবাদতে শরীক হবে। রাসুল (সা.) এর হাদিস অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা এই দিনটিকে প্রতি জাতির সমাবেশের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু তারা এটিকে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। তবে মুসলমানদের সৌভাগ্য যে, তারা এই দিনটিকে নিজেদের সাপ্তাহিক উৎসবের দিন হিসেবে পালন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

তবে মুসলিমদের এই চয়ণে প্রাচীন আরবদের অবদানও খাটো করে দেখার উপায় নেই। কোরাইশদের পূর্বপুরুষের মধ্যে একজন ছিলেন কা’ব ইবনে লুয়াই। যিনি রাসুলুল্লাহর জন্মের পাঁচশত ষাট বছর পূর্বে ইন্তেকাল করেছিলেন। তাফসীরে মাযহারী অনুযায়ী শুক্রবারে সমবেত হয়ে ইবাদত করার রীতি তিনিই আরবদের মধ্যে প্রচলিত করেছিলেন। যদিও আরবরা এই দিনটিকে জুমার দিন না বলে বলতো ‘ইয়াওমে আরূবা’। এদিন কোরাইশরা সকলে একত্রিত হতো, কা’ব ইবনে লুয়াই ভাষণ দিতেন। সেই থেকে জাহিলী যুগের আরবরা এই দিনকে সম্মান করতে শুরু করেছিল। পরবর্তীতে যখন ইসলামের আগমণ ঘটল তখনও এটিকে সম্মানিত দিন হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

 

সেই থেকে সর্বযুগে মুসলিমদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে জুমার দিনটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে এসেছে।

জুমা আদায়ের জন্য শহর হওয়া, শাসক ও নাগরিকদের উপস্থিতি ইত্যাদি নানাবিধ শর্ত রয়েছে, কেননা জুমার মাধ্যমে কেবল একটি জামাতের নামাজ আদায়ের উদ্যেশ্যই পূরণ হয় না, বরং একই সঙ্গে একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর কাছে রাষ্ট্রীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবেও একে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া সামাজিক কর্মকাণ্ড, বিবাহ, বিচার, মতবিনিময় ইত্যাদি কাজেও জুমার গণজমায়েতকে কাজে লাগানো হতো। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত আমল তো রয়েছেই। এসব দিক বিবেচনায় এটা বলা যায় যে, জুমার দিনটি মুসলিমদের জীবনে নানামাত্রিক ভূমিকা নিয়ে উপস্থিত হয়ে থাকে৷

ইসলামের প্রথম জুমা
জুমা ফরজ হয়েছিল মক্কি জীবনেই। তবে মক্কার অনিরাপদ পরিবেশে রাসুল (সা.) জুমা আদায় করেননি। রাসুল (সা.) প্রথম জুমা আদায় করেন মদিনার উপকণ্ঠে শারবাতালিয়্যাহ নামক জায়গায়। তবে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম জুমা এটি নয়। সর্বপ্রথম জুমা আদায় করেন বিখ্যাত সাহাবি আসআদ ইবনে যুরারাহ। মদিনায় হিজরতের পূর্বে যখন রাসুল (সা.) মুসআব ইবনে উমায়ের (রাযি.) আনহুকে মদিনার আমীর করে পাঠালেন তখন তাঁকে জুমা কায়েম করতে আদেশ করেছিলেন। এদিকে মদিনার মুসলমানগণও একটি দিন খুঁজছিলেন সাপ্তাহিক সমাবেশের জন্য৷ কেননা মদিনার অধিবাসী ইহুদি ও খ্রিস্টানরা যথাক্রমে শনিবার ও রবিবারে নিজেদের সাপ্তাহিক প্রার্থনার দিন হিসেবে নির্ধারণ করে রেখেছিল। পরবর্তীতে রাসুলের আদেশ তাদের সেই ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের পথে আর বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

জুমার দিনের গুরুত্ব
এতসব আয়োজন ও মর্যাদা যে দিনের জন্য, সে দিনটিকে আল্লাহ তায়ালা নির্বাচন করেছেন বিনা কারণে নয়, বরং এই দিনটির সঙ্গে সৃষ্টিজগতের গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু ঘটনার সংযোগ রয়েছে। তাফসিরে ইবনে কাসীরের সূত্রে আল্লামা শফী (রাহ.) লিখেছেন, আল্লাহ তায়ালা নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও সমস্ত জগতকে ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। এই ছয়দিনের শেষদিন ছিল জুমার দিন। এই দিনেই আদম (আ.) সৃজিত হন, এই দিনেই তাকে জান্নাতে দাখিল করা হয় এবং এই দিনেই জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামানো হয়। কেয়ামত এই দিনেই হবে। এই দিনে এমন একটি মুহূর্ত আসে যখন মানুষ যে দোয়াই করে,  তাই কবুল হয়।’ (তাফসিরে মা'আরেফুল কুরআন, সূরা জুমুআ)

এছাড়া রাসুল (সা.) এর হাদিসে বর্ণিত আছে যে, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমুআর নামাজ উভয় জুমার মাঝে যত গুনাহ হয়েছে সবগুলোর কাফফারা (হিসেবে যথেষ্ট), যতক্ষণ না বান্দা কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়। (সহীহ মুসলিম) রাসুল (সা.) আরো বর্ণনা করেন যে, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে অথবা রাতে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহ তাকে কবরের পরীক্ষা থেকে রক্ষা করবেন।’ (সুনানুত তিরমিজি)
এইসব আয়াত ও হাদিস দ্বারা এটিই প্রমাণিত হয় যে আল্লাহর কাছে এই দিনটির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাই তিনি এই দিনটিকে মুসলমানদের সাপ্তাহিক উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যাতে বান্দা দুনিয়াবি কাজ থেকে অবসর হয়ে বিশেষ ভাবে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত হতে পারে। এবং এতে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ দোয়া কবুলের ওয়াদাও আল্লাহ তাআলা করেছেন।

জুমাতুল বিদা
আমাদের বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশে জুমাতুল বিদা বিশেষ ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালন করার রীতি প্রচলিত আছে। মূলত, রমজানুল মুবারকের শেষ যে জুমাটি থাকে সেটিকেই ‘জুমাতুল বিদা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এই দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ দোয়া, মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।

তবে আসল কথা হচ্ছে, কুরআনে অথবা রাসুল (সা) এর হাদিসে রমজানের সর্বশেষ রোজার কোনও আলাদা ফজিলত বর্ণিত হয়নি। বরং এটিও রমজানের অন্য জুমাগুলোর মতোই একটি জুমা। এই জুমায় ইবাদত করলে যে সাওয়াব হবে, অন্য জুমায় ইবাদত করলেও একই সাওয়াব পাওয়া যাবে। যদি কেউ জুমাতুল বিদার আলাদা কোনও মর্যাদা আছে বলে ধারণা করেন সেটি হবে বিদআত। তবে রমজানের শেষ জুমা হিসেবে যদি কেউ বাড়তি ইবাদতের উৎসাহ বোধ করেন, এবং নফল ইবাদতে লিপ্ত হন, তা অবশ্যই একটি উত্তম কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে। কেননা রমজানের প্রতিটি দিনই মূল্যবান, সেই সঙ্গে যদি জুমার ফজিলত যুক্ত হয় তবে বাড়তি ইবাদতের প্রেরণা পাওয়ারই কথা।

জুমার দিনে করণীয়
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘এটি উৎসবের দিন, যা আল্লাহ মুসলমানদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি জুমায় আসে সে যেন গোসল করে। যদি তার কাছে সুগন্ধি থাকে তাহলে যেন ব্যবহার করে।’ (আত তারগীব ওয়াত তারহীব)

এই হাদিস থেকে এটা স্পষ্ট যে জুমার দিনে কিছু কাজ আছে, যেটা একজন মুসলমানের পালন করা উচিত। যেমন,

১. জুমার দিন সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা সুন্নত। কেননা এটি মানুষকে ফিতনা থেকে রক্ষা করে।

২. জুমুআর আজান দিলে জুমার প্রস্তুতি বাদে অন্য সকল কাজ থেকে বিরত থাকা। কেননা আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, ‘মুমিনগণ, জুমার দিনে যখন নামাজের আজান দেওয়া হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে ত্বরা করো এবং বেচাকেনা বন্ধ করো।’ (সুরা জুমুআ, ১০)

সমস্ত মুফাসসিরগণ এই ব্যাপারে একমত যে, এখানে বেচাকেনা বন্ধ করতে বলার দ্বারা এটিই উদ্দেশ্য যে, জুমার নামাজের প্রস্তুতি বাদে সকল কাজ থেকে বিরত থাকা।

৩. জুমুআর দিন গোসল করে পাক-পবিত্র হওয়া, সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে উপস্থিত হওয়া। ইমাম সাহেবের নিকটবর্তী হয়ে মনোযোগ দিয়ে তাঁর আলোচনা শোনার চেষ্টা করা, কোনও ধরনের অনর্থক কাজে লিপ্ত না হওয়া। কেননা এর ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করলো, দ্রুত মসজিদে গেলো, কোনও বাহন না ব্যবহার করে হেঁটে মসজিদে গেল। ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বসল, মনোযোগ দিয়ে শুনল এবং কোনও অনর্থক কাজ করলো না, তার প্রতি কদমে একবছর নামাজ পড়া ও রোজা রাখার সাওয়াব লেখা হবে। (আত তারগীব, ওয়াত তারহীব)

৪. জুমার দিনে আসরের পরের সময়টুকু দোয়া ও ইবাদতে কাটানো। কেননা রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘জুমুআর দিন আসরের পর থেকে সূর্য ডোবা পর্যন্ত তোমরা অন্বেষণ করো। (আত তারগীব)

৫. জুমার সারা দিন ও রাতে যতোটুকু সম্ভব নফল ইবাদত ও দোয়ায় লিপ্ত থাকা। কেননা জুমার দিনের একটি মুহূর্ত এমন আছে যেখানে বান্দা যে দোয়াই করে তা কবুল করে নেওয়া হয়।

মাত্র রমজান শুরু হলো। আল্লাহ এই রমজানের প্রতিটি জুমার দিনকে ইবাদত ও আমলের দ্বারা রঙিন করে নেওয়ার তৌফিক দান করুন। অতীতের সমস্ত গোনাহগুলোকে মাফ করিয়ে নিয়ে শুদ্ধ ও সুন্দর মানুষ হিসেবে নতুন করে জীবনযাত্রায় অবতীর্ণ হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

লেখক: তাকমিল (স্নাতকত্তোর), আল হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতল কওমিয়্যাহ; অধ্যয়নরত, ক্রিয়েটিভ আইটি ইনিস্টিটিউট




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top