ঢাকা রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বইয়ের বোঝায় ন্যুব্জ শিশুরা

আবদুল হাই তুহিন | প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল ২০২২ ০২:০৭; আপডেট: ২৯ মে ২০২২ ১৪:০৭

তাকওয়া ইসলাম রাজধানীর শেরেবাংলা আইডিয়াল স্কুলের প্রাক প্রাথমিকের শিক্ষার্থী। সবে শিক্ষাজীবন শুরু করেছে সে। তার স্কুলের পাঠ্যবই ৬টি, সঙ্গে খাতাও ৬টি। এছাড়া ড্রয়িং তো থাকছেই। ফারদিন শাহরিয়ার অর্ক রাজধানীর মাইলস্টোনে ইংরেজি মাধ্যমে ১ম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। তারও বই সংখ্যা ৬টি। সঙ্গে ৬টি খাতাও রয়েছে। তাদের বই-খাতা, পানির পট, টিফিন বক্স, রং পেন্সিল বক্স-এসব আনুষঙ্গিক জিনিস দিয়ে ব্যাগ ভরে যাচ্ছে। 
সব মিলিয়ে ব্যাগের ওজন আট থেকে ১০ কেজিও হয়ে থাকে। প্রতিদিন দুবার এই বইয়ের বোঝা টানতে হয়। কেবল তাকওয়া ও অর্কই নয়। সারাদেশের কোটি শিশু বইয়ের বোঝায় ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বোর্ড বইয়ের বাইরেও শিশুদের নানা ধরনের বই পড়ানো হয়। ফলে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝায় ব্যাগ ভারী হয় শিক্ষার্থীদের আর ব্যবসা বাড়ে স্কুল মালিকদের। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সে লক্ষ্যে প্রায় ৫ বছর আগে শিক্ষার্থীদের বইয়ের বোঝা কমাতে অনুশাসন দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ৫ বছরেও বইয়ের সংখ্যা কমানোর কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এদিকে কেবল প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনই নয় শ্রেণী অনুসারে বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে নির্ধারণ করার নির্দেশনা দিয়েছিল আদালতও। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীর শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারি ব্যাগ বহন করা যাবে না বলে রায় দিয়েছিল আদালত। সেই আদেশও বাস্তবায়িত হয়নি এখনো। জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ও কার্যত কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। 
অসংখ্য পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে হাফ ডজন পর্যন্ত অনুমোদনহীন বই চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর। ফলে প্রতিনিয়তই ভারি বইয়ের ব্যাগ পিঠে নিয়ে চলতে হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীদের। ফলে একদিকে যেমন মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অন্যদিকে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী নানা রোগে। শিশুরা প্রতিদিন প্রায় ১০ কেজি ওজন বহন করে চলছে। বেসরকারি স্কুল বিশেষত শহরাঞ্চলের কিন্ডারগার্টেনে শিশুদের ১৩ থেকে ১৪টি বিষয়ও চাপিয়ে দেয়া হয়। এসব বই প্রকাশনা সংস্থার কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিষ্ঠানগুলো। 
এনসিটিবি প্রতিবছর অনুমোদনহীন এসব বই পড়ানোর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলেও ফলাফল শূন্য। কারণ এ অপরাধ দমনে নেই মন্ত্রণালয়সহ সরকারের অন্য কোন নজরদারি। দেশের অন্যতম দুই নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। 
দুই প্রতিষ্ঠানের শিশু ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে সরকারি নির্দেশ মেনে কেবল জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) অনুমোদিত বই পড়ানো হয়। 
কিন্তু সরকার অনুমোদিত বই হলেও রক্ষা নেই শিশুদের। ষষ্ঠ শ্রেণীর একটি শিশুকে পড়তে হচ্ছে ১২ বিষয়। যার জন্য পাঠ্যবই রয়েছে সমপরিমাণে। সারাদেশে সরকার এই শ্রেণীতেই একজন শিশুকে পড়তে হচ্ছে বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র। ইংরেজী প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র। কৃষি শিক্ষা, অঙ্ক, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, ধর্ম, কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা, চারু ও কারুকলা এবং সমাজ।
শিশুদের এক ডজন বই ও সমপরিমাণ খাতা নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে যুক্ত আছে প্রতিটি বিষয়ে ভাল করার জন্য শিক্ষকদের দেয়া কোচিং পড়ার চাপ। মতিঝিল আইডিয়ালের কৃষি শিক্ষা বিষয়ে কোচিং যারা করেছে শিক্ষক তাদের প্রত্যেককে ৯০ বা তার ওপরে নম্বর দিয়েছে সর্বশেষ পরীক্ষায়। কিন্তু যারা কোচিং করেনি তাদের শিক্ষক ৬০ নম্বরের বেশি দেননি বলে অভিযোগ অভিভাবকদের। প্রত্যেক অভিভাবকই বলছেন, অসংখ্য বইয়ে চাপ সহ্য করতে না পেরে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে প্রায়ই। প্রতিদিন ১২ বিষয়ের ক্লাস না হলেও অন্তত সাতটি ক্লাস হয়। সেক্ষেত্রে সাতটি বই, সাতটি খাতা, কলম, পানির বোতল, খাবারসহ প্রত্যেক শিশুদের একটি বিশাল ব্যাগ বহন করতে হয় প্রতিনিয়ত।
প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী পার হলেই শুরু হয় অসংখ্য অনুমোদনহীন বই পড়ানোর চাপ।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি হাসপাতালে এক অভিভাবক তার শিশু সন্তানকে নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। কারণ প্রাথমিকের ওই শিশুটির কদিন ধরেই পিঠে ব্যথা। ব্যথা অনুভবের পর শিশুটির বাবা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক দেখে বললেন, ঘাড়ে ভারি ব্যাগ বহনের কারণে শিশুটির হাড়ে সমস্যা হচ্ছে।
এ সময় শিশুটি জানায়, তাদের ক্লাসের অনেকেরই এমন হয়। কিন্তু সব বই ক্লাসে না নিয়ে আসলে শিক্ষকরা রাগারাগি করেন তাই সবাই বই খাতা নিয়ে আসে।
শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসকরা শিশুদের ওপর থেকে বইয়ের বোঝা কমানোর তাগিদ দিয়ে বলেছেন, উন্নত দেশের মতো শ্রেণীকক্ষের শিক্ষা বইহীন করা না গেলেও যে কোন উপায়ে বইয়ের সংখ্যা কমানো জরুরি।
এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, আগামী ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে শ্রেণীক্রম অনুসারে শিক্ষার্থীদের বইয়ের সংখ্যা কমবে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত কাজ চলছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক বেশি বই পাঠ্য করা হচ্ছে এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমরা জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্দেশিত বই ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠান পড়ালে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। 
জানা গেছে, শিশু শিক্ষার্থীদের কাঁধে বইয়ের বোঝা কমাতে ইতোমধ্যেই উদ্যোগী হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। শ্রেণী অনুসারে বইয়ের সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়ার পাশাপাশি শ্রেণী কক্ষে শিক্ষা বইহীন করার বিষয় নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করেছে দেশটি। আবার কোন রাজ্যে বাসায় ও স্কুলে মোট দুই সেট বই দিয়ে স্কুল ব্যাগহীন করার উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা চলছে।
দেশটির ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ এ্যান্ড ট্রেনিং’ তাদের দেয়া এক সুপারিশে জানিয়েছে, প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশুদের কাঁধে স্কুল ব্যাগে মাত্র দুটি পাঠ্যবই দেয়া যাবে। তিনটি বই দেয়া যাবে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীর শিশুদের স্কুল ব্যাগে। বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগে এর চেয়ে বেশি বই দেয়া হলে স্কুল এবং অভিভাবক দু’পক্ষকেই জরিমানা এবং নোটিস পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে ওই সুপারিশমালায়। 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেসরকারি ভুঁইফোঁড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত চটকদার বই শিশুপাঠ্যভুক্ত করা হচ্ছে অধিকাংশ বেসরকারি স্কুলে। বইয়ের দামও চড়া। কোন কোন ক্ষেত্রে ২০-২৫ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম ৪০০-৫০০ টাকা। 
প্রথম শ্রেণীতে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের ওপর মাত্র তিনটি বই দেয়া হয়। কিন্তু এর বাইরে কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ১০টি পর্যন্ত পাঠ্যবই তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। 
এর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ নিচ্ছে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। নামী প্রতিষ্ঠানে বই পাঠ্য করতে বেশি টাকা দিতেও রাজি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। বেশি শিক্ষার্থী হলেও বেশি টাকা। নামী প্রতিষ্ঠানে বই পাঠ্য করতে পারলে এসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আবার তা সারাদেশে প্রচার করে অন্যদের প্রভাবিত করে এভাবেই চলছে এই বেআইনি বই বাণিজ্য। 
যার মূল্য দিচ্ছে শিশুরা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিক্যালের চিকিৎসক ডা. সমরেশ হাজরা সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, সেন্ট জোসেফে তৃতীয় শ্রেণীর একটি শিশুকে যেসব বিষয় পড়ানো হয় সেসব বিষয়ের প্রশ্ন আমার ধারণা দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাতেও আসে না। এভাবে শিশুদের ওপর চাপ দিলে নেতিবাচক ফল হবেই। ভারি ব্যাগ বহন করার কারণে শিশুর হতে পারে আর্থ্রাইটিসের মতো রোগ। এসব বিষয়ে নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
ভারি ব্যাগের কারণে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ব্যাক পেইন বা মেরুদন্ডের ব্যথায় ভোগার আশঙ্কা রয়েছে। শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই ভার বহন করে, তাহলে তাদের বাঁকা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাদের ‘অস্থি-মাসলে’ যে ‘স্ট্রেনথ’ থাকার কথা, সেটা কমে যায় একেবারেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতা অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল বলেন, শিশুদের ওপর পরীক্ষা ও বইয়ের বোঝা অবশ্যই কমাতে হবে। অন্যথায় শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ হবে বাধাগ্রস্ত। আমাদের এখন উন্নত দেশগুলো যেমন জাপান, ফিনল্যান্ডের দিকে তাকাতে পারি। উন্নত দেশগুলোতে এভাবে আমাদের মতো পরীক্ষা নেয় না। এভাবে দেয়া হয় না। শিশুদের সত্যিকারের মেধাবী করতে হলে তাদের ওপর বইয়ের চাপ কমিয়ে সহশিক্ষায় ওদের ভাল সুযোগ করে দিতে হবে। খেলাধুলা, শিল্প সংস্কৃতিতে জোর দিতে হবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ক কমিটির সদস্য সচিব ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক শেখ একরামুল কবির বলছিলেন, বইয়ের বোঝা কমানো খুব জরুরি। কারণ বইয়ের বোঝা ও পরীক্ষার চাপে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভারি বইয়ের ব্যাগ বহন করতে যাতে না হয় সেজন্য পদক্ষেপ দরকার। অনুমোদনহীন বই যাতে কোথাও না পড়াতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। 
 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top