ঢাকা শনিবার, ২৪ জুলাই ২০২১, ৮ শ্রাবণ ১৪২৮

মাঠে না নামার প্রতিশ্রুতি দিয়েও হেফাজতের তাণ্ডব

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ২৯ মার্চ ২০২১ ০৩:০৮; আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২১ ০৫:০৫

নারায়ণগঞ্জ প্রশাসনের কাছে মাঠে না নামার প্রতিশ্রুতি দেন জেলা হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল আউয়াল। এরপর তারা শহরের রাস্তায় না নামলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগাং রোড থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত রাস্তায় দফায় দফায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায় হরতাল সমর্থকরা। যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়। নির্বিচারে ভাঙচুর করে। গণমাধ্যমকর্মীরা ছিলেন তাদের হামলার টার্গেট। পুলিশের সঙ্গে দিনভর তাদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে।  মহাসড়ক বন্ধ থাকায় দুর্ভোগের শিকার হন সাধারণ মানুষ।

রবিবার (২৮ মার্চ) ফজরের নামাজের পর পরই নগরীর ডিআইটি মসজিদে জড়ো হয় হেফাজত কর্মীরা। জেলা হেফাজতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুল আউয়াল এ মসজিদের খতিব। বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যরা সকাল থেকেই এ মসজিদ ঘিরে রাখে।  মসজিদের বাইরে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলেই বিজিবি ও পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়।

 

বেলা ৮টার দিকে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, র‌্যাব ও বিজিবির কয়েকজন কর্মকর্তা গিয়ে জেলা হেফাজতের আমির মাওলানা আব্দুল আউয়ালের সঙ্গে দেখা করেন। পরে বের হয়ে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রশাসনের অনুরোধে মাওলানা আব্দুল আউয়াল তাদের জানিয়েছেন যে মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরার যাতে কোনও বিঘ্ন না ঘটে সে ব্যাপারে তারা সহযোগিতা করবেন।

 

তবে এর আগেই সকাল সাতটা থেকে হেফাজত কর্মীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল মোড় থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত অবস্থান নেয়। তারা দফায় দফায় মিছিল করতে থাকে। ডাচ বাংলা ব্যাংকের মোড়, মৌচাক মোড়সহ কয়েকটি পয়েন্টে টায়ার, কাঠের পুরনো চকিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্রে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তায় অবরোধ তৈরি করে।

বেলা ১১টার দিকে শিমরাইল মোড়ে হেফাজতে ইসলাম একটি সমাবেশ করে। এ সমাবেশে বক্তারা ঘোষণা দেয়, তারা আপাতত এ কর্মসূচি স্থগিত করছে।

এসময় মহাসড়কের একপাশ দিয়ে অল্প কিছুক্ষণ যানবাহন চলাচল করে। থেমে থাকা কয়েকটি ট্রাক চলাচলের উদ্যোগ নিলে একদল হরতাল সমর্থক নির্বিচারে ট্রাক, বাস ভাঙচুর শুরু করে।  সিদ্ধিরগঞ্জের মাদানীনগর মাদ্রাসার সামনে দুপুর একটার দিকে হঠাৎ করেই থেমে থাকা একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পরে আরেকটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। এরপর বেলা তিনটার মধ্যে দুইটি পিক-আপ ভ্যান, দুটি ট্রাক ও দুইটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। তাদের বাধা দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে হেফাজত কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ ধাওয়া করলে তারা মহল্লার ভেতরে ঢুকে যায়।

টার্গেট সাংবাদিকরা

ঘটনার শুরু থেকেই গণমাধ্যমকর্মীরা ছিল হেফাজত কর্মীদের টার্গেট। গণমাধ্যমকর্মী জানলেই তারা আক্রমণ করেছে। একাধিকবার হামলার শিকার দৈনিক সংবাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি সৌরভ হোসেন সিয়াম জানান, দুপুর দুইটার দিকে মাদানী নগর মাদ্রাসার অদূরে পোড়ানো বাসের ছবি তুলতে গেলে হেফাজত কর্মীরা তাকে জিজ্ঞেস করে তিনি সাংবাদিক কিনা। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা তাকে মারধর শুরু করে। সৌরভ পাশের একটি করাত কলে গিয়ে আশ্রয় নিলে সেখানেও তারা তাকে মারধর করে। তাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। তার মোবাইল ফোনের সমস্ত ছবি ডিলিট করে দেয়। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলে বের হওয়ার সময় আরেকবার মারধরের শিকার হন। প্রায় একই সময় সাইনবোর্ড এলাকার প্রো-একটিভ মেডিক্যাল হাসপাতালের সামনে বেসরকারি টিভি চ্যানেল নিউজ টুয়েন্টি ফোরের গাড়িতে হামলা চালানো হয়। গাড়িতে থাকা নারী সংবাদ কর্মী ও গাড়ি চালককে তারা লাঞ্ছিত করে। এসময় সহকর্মী সাংবাদিকরা তাদের সহায়তায় এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে হেফাজত কর্মীরা সাংবাদিকদের লক্ষ করে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। পরে পুলিশ ও বিজিবি গিয়ে তাদের উদ্ধার করে আনে। এছাড়া একাত্তর টেলিভিশন, আরটিভি’র সংবাদ কর্মীরাও লাঞ্ছনার শিকার হন।  বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে পুলিশ বিজিবি যৌথভাবে হরতাল সমর্থকদের দাওয়া দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এসময় পেছনে পেয়ে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের রিপোর্টার রায়হান কবির, বৈশাখী টিভির আশিক মাহমুদসহ দুই টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসনকে বেধড়ক মারধর করে আহত করে। এর আগে দুপুর আড়াইটার দিকে গাজী টেলিভিশনের রিপোর্টার রূবিনা ইসলাম ও ক্যামেরাপারসন মাসুদুর রহমানকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটায়। এ সময় গাজী টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন তাদের হামলা থেকে বাঁচতে  পাশের একটি বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু হরতাল সমর্থকরা তাকে বাথরুম থেকে বের করে এনে মাথায় ও শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করা হয়।

হেফাজত মাঠে না নামার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নামলো কেন—এ বিষয়ে জেলা হেফাজতের আমির মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘আমি কিছু জানিনা। আমি কথা বলতে পারবো না।’ 

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোয়েন্দা পুলিশ) জাহেদ পারভেজ চৌধুরী জানান, এ ঘটনায় ২০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বলেন, হেফাজতের  নেতাকর্মীরা সকাল ১১টার মধ্যে মোনাজাত করে রাস্তা থেকে সরে গেছে। কিন্তু কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক সকাল থেকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিশে পুলিশকে লক্ষ করে ইট-পাটকেল ছুড়ে। রাস্তায় ও যানবাহনে আগুন দিয়ে স্লোগান দেয়।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top