ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮

বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ

মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম | প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২১ ০২:২০; আপডেট: ২৪ জুন ২০২১ ০৬:৫৯

‘সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের’ কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় এই পরম প্রত্যয়টি ব্যক্ত হয়েছে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার সামনে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপটে। দেশবিভাগের পর থেকে পরবর্তী ২৪ বছরে কঠোর পরিশ্রম করে বঙ্গবন্ধু সাত কোটি বাঙালির মধ্যে অধিকার আদায়ের দৃঢ় প্রত্যয় জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। একটু একটু করে শোষিত-বঞ্চিত গণমানুষের মধ্যে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র গঠনে প্রয়োজনীয় অসাম্প্রদায়িক চেতনাসমৃদ্ধ সম্মিলিত প্রয়াস সৃষ্টি করে একটি গণজোয়ার প্রবাহিত করতে পেরেছিলেন। সেই কারণেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে কৌশলে বলে যাওয়া স্বাধীনতার ঘোষণাটি উপলব্ধি করতে পেরেছিল বাঙালি—তারা ভাবতে শিখেছিল ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি তাদের, স্বাধীনতা তাদের অধিকার।

প্রচলিত ধারায় রাজনীতি করে ক্ষমতা ও খ্যাতি অর্জনের রাজনীতিক তিনি ছিলেন না। তাঁর রাজনীতির মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববাংলার গণমানুষের অধিকার আদায়। শুরুতে মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথেই ছিলেন তিনি। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ তিনিও করেছেন। পরে তাঁর চিন্তার পরিবর্তন হয়। পরিবর্তনের কারণ মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতাদের কার্যকলাপ। বিভিন্নমুখী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মুসলিম লীগের রাজনীতি থেকে বাঙালি মুসলমানদের ক্রমে বিতাড়িত করা এবং অবাঙালিদের হাতে মুসলিম লীগের রাজনীতি কুক্ষিগত হওয়ার প্রেক্ষাপট তিনি কলকাতায় থাকতেই প্রত্যক্ষভাবে দেখেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতাদের দ্বারা পূর্ববাংলার গণমানুষের উন্নয়ন সম্ভব নয়। যুবক মুজিব মানসিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছিলেন নিজের ভবিষ্যৎ আদর্শিক কর্মপন্থা সম্পর্কে। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতা থেকে স্থায়ীভাবে ঢাকায় ফিরে আসেন। এসে মুসলিম লীগবিরোধী রাজনীতির গোড়াপত্তন করেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ১৮ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণ গণমানুষের অধিকার আদায়ের রাজনীতির মাধ্যমে প্রায় আড়াই হাজার বছরের বিদেশি-বিভাষী শাসনের নাগপাশে আবদ্ধ থাকা নির্জীব-নিরীহ, পরাধীনতাকে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বলে মেনে নেওয়া বাঙালি জাতির মনে-মননে তিনি নতুন করে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলেন। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই বাঙালির মনে স্বাধীনতার স্পৃহা জেগে ওঠে এবং বঙ্গবন্ধুর আহ্বানই তাদের জীবনে শেষ কথা বলে প্রতিভাত হয়। ’৫২-এর ভাষা-আন্দোলন থেকেই বাঙালি ক্রমে জেগে উঠতে শুরু করে এবং ’৭১-এর ৭ মার্চের সেই দীপ্ত আহ্বানে তারা ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ “Finest Fighting Machine” বলে খ্যাত প্রশিক্ষিত পাক সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত হয়। পরিশেষে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি সম্পূর্ণরূপে নিজের করে নিতে পেরেছিল বাঙালি—১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে। বাঙালি আজ অনির্বচনীয় আনন্দ ও গর্বের সাথে ২৬ মার্চ, ২০২১ স্বাধীনতার সুবর্ণ-জয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছে।

 

বঙ্গবন্ধু কি গোড়া থেকেই একটি স্বাধীন বাংলাদেশের কথা ভেবেছিলেন? সেই লক্ষ্যেই কি আন্দোলন শুরু করেছিলেন? এ কথার উত্তর খুঁজতে বলতে হয় তিনি মূলত যে কাজটি শুরু করেছিলেন তা হলো বাঙালির মনে অধিকার আদায়ের প্রত্যয় জাগিয়ে তোলা। স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সৃষ্টি হওয়া ’৬৯-এর গণজাগরণের বিস্ফোরণ ঘটে ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন। পাকিস্তানের উভয় অংশে সর্বোচ্চসংখ্যক নির্বাচনী আসনে জয়লাভ করে এক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তিনি যে সরকার গঠনের পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তা ছিল ৬-দফা ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন। দেশভাগের পর পাকিস্তান সরকার পূর্ববাংলার প্রতি যে বৈষম্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে শোষণ অব্যাহত রেখেছিলেন তারই অবসান হতে যাচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ’৭০-এর নির্বাচনে জনগণের দেওয়া ম্যানডেটের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন—এর একটা গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষ্য ৬-দফার মধ্যে বিবৃত হয়েছে। লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি সমাজ তথা দেশ বিনির্মাণ। তিনি সেটা পাকিস্তানের সাথে থেকেই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকরা তাদের ভেদ-বুদ্ধির কারণে বঙ্গবন্ধুর এই সৎ উদ্দেশ্যটি বুঝতে অক্ষম হলো। তারপরের ইতিহাস আমাদের সকলেরই জানা। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ব্যাপক আত্মত্যাগ ও সম্পদ বিসর্জন করে শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ পেয়েছি আমরা।

 

বঙ্গবন্ধু কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, কেমন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন—সেটা উপলব্ধি করা যায় পাকিস্তানে বৈষম্যনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের মধ্য দিয়ে। কারণ, সর্বক্ষেত্রে যখন কোনো দেশে বৈষম্যপূর্ণ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তখন সেই দেশটি ক্রমে পিছিয়ে পড়তে থাকে অর্থনীতি-রাজনীতি-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে। ক্রমে দেশটির মেরুদণ্ড ক্ষয় হতে থাকে। সেই জাতি কখনো মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে না, অন্যদের তাঁবেদারে পরিণত হয় জাতি এবং অন্যের দয়াদাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় সর্বক্ষেত্রে। পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলে পূর্ববাংলার মানুষের প্রতি তেমনি আচরণ পাকিস্তান সরকার করে আসছিল যাতে এই জাতি চিরকাল তাদের তাঁবেদার হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে সৌভাগ্যবশত জন্মেছিলেন বঙ্গবন্ধুর মতো একজন স্বপ্নদ্রষ্টা কীর্তিমান বাঙালি। আপসকামী না হয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মন্ত্র শিখিয়ে ছিলেন। তারই ফল স্বাধিকার আন্দোলন এবং পরিশেষে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু কেমন বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলেন? ৬-দফা ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের আদলে পূর্ববাংলা কেমন হবে, তা জানা গেল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ কেমন করে কোন নীতির ভিত্তিতে অগ্রসর হবে সেকথা বঙ্গবন্ধুর নিজের কথা থেকে জানা যাক। পাকিস্তানের জেলে আটকাবস্থায় অসহ্য মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ভোগ করে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে ১২ জানুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে শপথ নিয়ে কোনো রকম বিশ্রাম ছাড়াই দেশগঠনের কাজে নেমে পড়েন। ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে তিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁর দেশের প্রাণপ্রিয় মানুষের সামনে দাঁড়ালেন বিজয়ের আনন্দে আবেগ-আপ্লুত হয়ে। মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের প্রতি অপার শ্রদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে নিরীহ-নির্যাতিত মানুষের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে তিনি সকল বাঙালির প্রতি ৭ মার্চের মতো আবার উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানালেন—গত ৭ মার্চ আমি এই রেসকোর্সে বলেছিলাম ‘দুর্গ গড়ে তোল’। আজ আবার বলছি আপনারা একতা বজায় রাখুন। ... আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, নেতা হিসেবে নয়, আপনাদের ভাই হিসেবে বলছি আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা যদি চাকরি না পায়, তাহলে আমাদের স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে । পূর্ণ হবে না। ... আমি সালাম জানাই—সংগ্রামী শ্রেণীকে, কৃষককূলকে, বুদ্ধিজীবীদের। বাংলাদেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একটি লোককেও আর না খেয়ে মরতে হবে না। [মোনায়েম সরকার সম্পাদিত, বাঙালির কণ্ঠ, পৃষ্ঠা ২৭৯-৮২]

১৯৭২ সালে ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে বেতার ও টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বললেন—

‘আমি আশা করবো, অতীতে আপনারা যেভাবে দুর্জয় সাহসে বুক বেঁধে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তাকে পরাভূত করেছিলেন, গভীর প্রত্যয় ও সাহস নিয়ে তেমনি বর্তমান সঙ্কটের মোকাবিলা করবেন। আমরা পুরাতন আমলের জীর্ণ ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে নতুন সমাজ গড়ে তুলব।...

শ্মশান বাংলাকে আমরা সোনার বাংলা গড়ে তুলতে চাই। সে বাংলায় আগামীদিনের মায়েরা হাসবে—শিশুরা খেলবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলব।... ক্ষেত খামার, কলকারখানায় দেশ গড়ার আন্দোলন গড়ে তুলুন। ... আসুন, সকলে মিলে সমবেতভাবে আমরা চেষ্টা করি যাতে সোনার বাংলা আবার হাসে, সোনার বাংলাকে আমরা নতুন করে গড়ে তুলতে পারি। [ঐ, পৃষ্ঠা ২৮৪-৮৯]

বাংলার জনগণের প্রতি দেশ গঠনের উদাত্ত আহ্বানের পাশাপাশি তিনি কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১০ মাসের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংবিধান উপহার দেন জাতিকে। কলকারখানা-ব্যাংক-বীমা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের মাধ্যমে সচল করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষপ্রতিষ্ঠানের বিধ্বস্ত অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এমন কোনো খাত ছিল না যেখানে পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর সরকারকে হাত দিতে হয়নি এবং সংকট কাটিয়ে উঠতে তার সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রেই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, তিনি দেশ গড়ার কাজে সকলের প্রতি যে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন সেখানে ক্রমে একটা ঘাটতির জায়গা প্রস্তুত হয় প্রতিক্রিয়াশীল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শক্তির ষড়যন্ত্রের কারণে। সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ের কারণে এবং বিশ্বব্যাপী শোষিত মানুষের পক্ষে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ের তোলার অঙ্গীকারের কারণেই শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রায় সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু জীবিত নেই, আছেন বাঙালির মনে-মননে। আছে তার নেতৃত্বে স্বাধীন হওয়া স্বপ্নের সোনার বাংলা।

স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা কি বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের বাংলাদেশে গড়তে পেরেছি? এই প্রশ্নের উত্তর হলো—সবটুকু হয়তো পারিনি কিন্তু সোনার বাংলা গড়ার কাজে আমরা অনেকদূর অগ্রসর হয়েছি। সবটুকু না পারার প্রধান কারণ বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে হত্যা করা। বঙ্গবন্ধু শুধু যে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, তা নয় তিনি তাঁর উদ্দেশ্যের কথা যা আমরা পূর্বেই বলেছি—একটি বৈষম্যহীন সমাজ তথা দেশ বিনির্মাণ। সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজে নেমে পড়েন। ’৭১-এর ৭ মার্চের মতো আবারও তিনি বাঙালিকে ডাক দিলেন তার দেশ গঠনের কাজে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করার। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনের কাজে দেশের অভ্যন্তরে অনুকূল পরিস্থিতি বিরাজ করা সত্ত্বেও মাত্র ৪ মাসের মাথায় সংবিধান রচনা, অর্থনৈতিক জোগান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ, কৃষি-শিল্পসহ নানা ধরনের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিয়মিত বাহিনীর পুনর্গঠন, যুদ্ধের কারণে উদ্বাস্তু হওয়া জনগণকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের পুনর্বাসন ইত্যাদি অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় সদ্য স্বাধীন একটি দেশের সরকারকে। এই সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সফলভাবে দেশ পুনর্গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় দেশের মানুষের নিঃশর্ত আন্তরিক সহযোগিতা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পরাজিত শক্তির সাথে আঁতাত করা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের নির্লজ্জ বিবেকহীন অসহযোগিতা-বিরোধিতার কারণে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে বারবার বাধার সম্মুখীন হন। তবুও তিনি থেমে যাননি। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন সোনার বাংলা গড়ার কাজে। অসহযোগিতা-বিরোধিতার কারণে ১৯৭৪ সালে দেশে একটি দুর্ভিক্ষ সংঘটিত করেও যখন দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা তাকে থামাতে ব্যর্থ হন তখন তারা বঙ্গবন্ধুকে সম্পূর্ণরূপে স্তব্ধ করে দেয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। পরের টানা ২১ বছর এবং পরবর্তীতে ২০০১ সাল থেকে পরবর্তী ৫ বছরে স্বাধীনতার বিরোধীশক্তি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের মাধ্যমে ন্যাক্কারজনক ব্যবচ্ছেদ ঘটিয়ে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয় বাংলাদেশ নামের একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকে। ৫০ বছর বয়সী একটা দেশে ২৬/২৭ বছরই যদি দেশটি সাম্প্রদায়িক বাতাবরণে চালিত হয় তাহলে সে দেশটির চরিত্র-বৈশিষ্ট্য এবং সে দেশের জনগণের দোদুল্যমান মানসিক অবস্থা অসাম্প্রদায়িক ও অর্থনৈতিকভাবে সফল একটি জাতিরাষ্ট্র গঠনের পথ যে আর সুগম থাকে না—সেকথা বলাই বাহুল্য। সেকারণেই বলতে হচ্ছে যে স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের কাজ সবটুকু শেষ হয়নি।

স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের দৃঢ় ও আস্থার প্রত্যয় হলো—আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার কাজ অনেকটাই এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হিসেবে শপথ গ্রহণ করে ২১ বছরের অন্ধকার দুহাতে সরিয়ে যখন আলোকবর্তিকা তুলে ধরলেন তখন জাতি পুনর্বার সত্যটা উপলব্ধি করতে পারল। সেই সত্যের আলোর পথেই এখন বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার রূপ ধরে। সময়ের হিসাবটা ৫০ বছর। তার মধ্যে ২৬ বছরই প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্ষমতার অপব্যবহারে সংবিধান থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি মৌলিক বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রমে পিছিয়েছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ৩ বছর ৭ মাস ৩ দিন স্থায়ী শাসনামলে যে সকল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন এবং টেকসই অর্থনীতির যে বুনিয়াদ গঠন করেছিলেন, তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই বুনিয়াদের ওপরই বাংলাদেশ বিনির্মাণ করছেন। গত এক যুগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে হেনরি কিসিঞ্জারের বলা সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’টি সম্পদ ভরে ছাপিয়ে উঠবার উপক্রম হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আমল থেকেই বাংলাদেশ যখনই এগিয়ে যেতে চেয়েছে তখনই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং যেকোনো মূল্যে সেই অগ্রগতির ধারাকে স্তব্ধ করার চক্রান্ত করেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনেও এই ষড়যন্ত্রকারীদের অপকৌশলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে হেরে যায় এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ আবারও বাধাগ্রস্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পুনরায় নির্বাচিত হন ২০০৯ সালে এবং গত একযুগ ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় রয়েছেন এবং সাফল্যের সাথে দেশ শাসন করেছেন। ২০০৮ সালে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭.৪৭ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ৪৪ বিলিয়ন ডলার। স্মর্তব্য যে, ২০০১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ আবার কমতে থাকে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার যখন আবার ক্ষমতায় আসে তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৮ বিলিয়নের মতো। এ তো মাত্র একটি খাতের উদাহরণ। যখনই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতায় আরোহণ করেছে তখনই অগ্রগতি ও উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রের সূচক সামগ্রিকভাবে নিম্নগামী হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর সাড়ে তিন বছরের কিছু বেশি সময়ের শাসনামলে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য যেসকল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা সেই ভিত্তির ওপরই দেশ গঠনের কাজ করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আরোহণ করে টানা একযুগ ধরে দক্ষতার সাথে দেশের শাসন কার্য পরিচালনা করে আসছেন। সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা পূর্বাপর এই দেড়যুগের শাসনামলে বাংলাদেশের এমন কিছু ছোট-বড়ো মৌলিক সমস্যার সমাধান করেছেন যেগুলো এতদিন স্থিতিশীল সমাজ ও টেকসই অর্থনীতির বুনিয়াদ নির্মাণের পথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অতি সম্প্রতি কমনওয়েলথের মহাসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী কমনওয়েলথভুক্ত দেশসমূহের মধ্যে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় ৩ জন বিস্ময়কর শীর্ষ ৩ নারী প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অন্যতম একজন অনুকরণীয় নারী নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

এ কথা দিবালোকের মতো সত্য যে, বঙ্গবন্ধু যেসকল পরিকল্পনা নিয়ে দেশগঠনের কাজে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তাতে তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে উল্লিখিত অর্জনসমূহ স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতেই বাংলাদেশ এর চেয়েও বেশি সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হতো। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা সফল প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সমৃদ্ধির পথেও অগ্রসরমাণ একটি দেশ। ৮ বিলিয়নের অর্থনীতি এখন ৩৮৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হিসেবে বিশ্বের ২৯তম বৃহৎ অর্থনীতিতে (পার্চেজিং পাওয়ার প্যারিটি অনুযায়ী) পরিণত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে,  গোটা বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে গৃহীত হয়েছে। United Nation’s Committee for Development Policy(UCDP)  কর্তৃক স্বাধীনতার ৫০ বছর পর বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে Landmark উত্তরণের প্রেক্ষিতে The Wall Street Journal তাং-০৩.০৩.২০২১ এ Mike Bird কর্তৃক দৃষ্টিনন্দন লেখার শিরোনাম ছিল এরূপ : Bangladesh Is Becoming South Asia’s Economic Bull Case : Countrys’ export have boomed over the past decade, while those of India and Pakistan have lagged behind. বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় আজ আর মানুষ অনাহারে থাকে না, শিক্ষার হারসহ মানুষের গড়আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জিডিপির গ্রোথ অত্যন্ত সন্তোষজনক এবং ক্রমে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে, প্রযুক্তির উৎকর্ষের সুবিধা ভোগ করছে, গভীর সমুদ্রে বন্দর, নদীর নিচ দিয়ে টানেল, ভূউপগ্রহে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে ঈর্ষান্বিত পর্যায়ে, পদ্মাসেতুর মতো প্রকল্প বাংলাদেশ আজ নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের আত্মবিশ্বাস এই যে, অচিরেই আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার তাৎপর্যপূর্ণ রূপায়ণ দেখতে পাব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এগিয়ে চলা বাংলাদেশে ‘সে বাংলায় আগামীদিনের মায়েরা হাসবে—শিশুরা খেলবে... যাতে সোনার বাংলা আবার হাসে।’

লেখক : ব্যাংকার




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top