ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ৯ আষাঢ় ১৪২৮

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর: নিয়তি ও ইতিহাস

দাউদ হায়দার | প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২১ ০২:১৬; আপডেট: ২৪ জুন ২০২১ ০৫:৫৬

গ্রিক পুরানের ‘ফেইট’ (ভাগ্য) এবং ‘নেমেসিস’ (নিয়তি) বহুল প্রচলিত, ব্যবহৃত শব্দদ্বয় খ্রিস্টিয় ধর্মযাজককুল প্রায়শ বলেন, স্মরণ করিয়ে দেন চার্চে উপবিষ্ট শ্রোতাদের। (ইদানীং আরো বেশি, করোনার প্রকোপে)। নিয়তির বোধহয় নানাবিধ তামাশা আছে। প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে। প্রকাশ ও অপ্রকাশের ভার কখন কীভাবে, নিয়তিই নাকি ঠিক করে সময়কালে। সময়ের ব্যবধানে। যেমন করেছে ঢাকার রমনার রেসকোর্স। একদা, ব্রিটিশ আমলের ঘোড়দৌড়ের মাঠ। কুড়ি দশকের রমনার অপরূপ শোভার কিছু উল্লেখ পাই বুদ্ধদেব বসুর লেখায়।

রেসকোর্সের নিয়তির খপ্পরে পাকিস্তান। কথায় বলে, ‘নিয়তির পরিহাস।’ ঠিকই তাই।

ইতিহাস বলছে, দুই পাকিস্তান (পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তান) আঁতুড়ঘর ঠিকমতো কাটেনি, আট মাসও অতিক্রান্ত নয়, পাকিস্তানের রাজধানী (করাচি) থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা) ঢাকায় হাওয়াই জাহাজে উড়ে এলেন। মার্চে (১৯৪৮)। জনসভায় ভাষণে ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানেও।

জিন্নাহ নিজে উর্দুভাষী নন। পশ্চিম পাকিস্তানের ৫ ভাগ মানুষও উর্দু বলে না। পূর্ব ০১ ভাগও নয়। পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা বাংলা। জনসংখ্যাও পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ (এখন বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। কুড়ি কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে ১৮ কোটি)।

ইসলাম ও দ্বিজাতিতত্ত্বের ধুয়ো তুলে পাকিস্তান (পূর্ব ও পশ্চিম) প্রতিষ্ঠা। জিন্নাহ’র বিশ্বাস, উর্দুর ক্ষেত্রেও এই ধুয়ো পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ হা করে গিলবে। কার্জন হলের ছাত্র সমাবেশেও একই কথা। প্রতিবাদ রেসকোর্সে, কার্জন হলেও। পরিণাম কী, ঠাওর করতে পারেননি। ভাষার প্রশ্নেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের শুরু। বীজ বপন জিন্নাহ’র। বীজ থেকে মহীরুহ। মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

বলছিলুম রেসকোর্সের নিয়তির কথা। ১৯৪৮ সালের মার্চে রেসকোর্সে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ভাষণ, জনগণ উপেক্ষা করেছে, থোড়াই কেয়ার করেছে দ্বিজাতিতত্ত্ব। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ, রেসকোর্স ময়দানে। স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক। সর্বাত্মক সংগ্রামের প্ররোচনা, আহ্বান । ‘…এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ বেলা দু’টোয় ১৯ মিনিটের ভাষণ। ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার ঘরে, মাঠপ্রান্তরে।

ভাষণ শুনেছিলুম মঞ্চের ২৫/৩০ ফুট দূর থেকে। পাছে জায়গা না পাই, সকাল ১০টার আগেই হাজির হই রেসকোর্সে। বাসা থেকে সময় লাগেনি অবশ্য, আমাদের বাসা মালিবাগ থেকে দেড় মাইলও নয়। প্রায় দৌড়েই গিয়েছিলুম। হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। নিজেরই লেখা: ‘স্বাধীনতা চাই।’

ইতিহাসের নির্মম রসিকতা নাকি নিয়তির প্রহার? যে রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর ভাষণ, ওই রেসকোর্সেই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ৭ই মার্চে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার। রেসকোর্সেই পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে। সেদিনও ছিলুম দেখতে। কাছে ঘেঁষতে পারিনি। ভারতীয় সেনারা আটকিয়ে দেন। দুই’শ বা তিন’শ গজ দূর থেকে দেখা। কৃষ্ণচূড়ার গাছে উঠে। স্পষ্ট দেখি, জেনারেল নিয়াজির মাথা নত। তাঁর পাশে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল ম্যাকেনশ। আরো একজন (পরে জানি, তাঁর নাম জ্যাকব।) নিয়াজির কলম স্বাক্ষর দেখিনি, দেখলুম, স্বাক্ষর শেষে গোটা রেসকোর্স ময়দানজুড়ে উল্লাস, চিৎকার ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ, স্বাধীন বাংলাদেশ। জয় বাংলা’। মানুষ আনন্দে দিশেহারা।

পাকবাহিনীর মূল জেনোসাইড (গণহত্যা) শুরু ২৫ মার্চের রাত ১২টার পরে। অর্থাৎ ২৬ মার্চ (ইংরেজি ক্যালেন্ডার হিসেবে) থেকে। এই দিনেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ঘোষিত। আত্মসমর্পণ ১৬ই ডিসেম্বর। বিজয় দিবস।

ঠিক যে, বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষার দাবি ও আন্দোলনেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার গোড়াপত্তন। তারপরেও কথা। ১৯৬৬ সালে লাহোরে পাকিস্তান বিরোধীদলীয় সম্মেলনে ছয় দফা উত্থাপন করেন। ছয় দফা ‘আগড়তলা ষড়যন্ত্র’ নামে খ্যাত।

ইতিহাস ঘাঁটছিনা, দীর্ঘ ইতিহাস।

নিয়তির নানা রূপ। প্রকাশ। ১৯০৬ সালে ঢাকার ‘আহসান মঞ্জিলে’ অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ-এর জন্ম। ইন্ডিয়ান কংগ্রেসের দেখাদেখি। ১৯৩০ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ বাংলাদেশ থেকে হাইজ্যাকড। উত্তর ভারতের মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও নেতাদের কবলে। হলেও, প্যারাডক্স, ১৯৪০ সালে (এপ্রিলে) লাহোরে পাকিস্তানের প্রস্তাবক এ কে ফজলুল হক (আবুল কাশেম ফজলুল হক। শেরেবাংলা নামে খ্যাত। বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন)। দেখতে পাচ্ছি, মুসলিম লীগের জন্ম, পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের গোড়ায় বাংলার অবদান।

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা ফাজলামো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ কোথায় আর পাকিস্তান কোথায়? অর্থনৈতিক দিক থেকে পাকিস্তান অনেক পেছনে। নারী শিক্ষায়, মানবিকতায় এমনকি বাকস্বাধীনতায়। যদিও বাংলাদেশে ইসলামি ধর্মান্ধতা বেড়েছে, বহু ইসলামি রাজনৈতিক দলের দাপট, মসজিদ, মাদ্রাসার বাড়ন্ত, সংবিধানের চার মূল নীতি নিশ্চিহ্ন, সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’, ‘রাষ্ট্রধর্ম’ সংযোজন। বহু ভালোর সঙ্গে বিস্তর খারাপও যোজিত। বৈশ্বিক রাজনীতি যুক্ত। বাংলাদেশ নিরুপায়। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আগুয়ান। নিক্সনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার (জন্ম জার্মানিতে) বলতেন ‘বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি।’ এখন কী বলবেন?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর, বিশ্বে উন্নত মস্তক। হোক। পাকিস্তানের এক নামী ঔপন্যাসিক রসিকতা করে বলেন, লন্ডনে, আড্ডায়, ‘বাংলাদেশ সৃষ্টিতে রয়েছে জিন্নাহরও অবদান। পূর্ব পাকিস্তানে যদি উর্দু চাপিয়ে না দিতেন, তোমরা আন্দোলন করতে না, সেই সময়। জিন্নাহ’র কথায় তোমাদের বোধ, স্বাধিকার, স্বাধীনতার স্পৃহা, আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ডিসেম্বরে পাকিস্তান ভেঙে গেছে। পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ। সেই দিন থেকে পাকিস্তানেরও ৫০ বছর।’ বললুম, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর আর তোমাদের পাকিস্তানেরও ৫০ বছর। নিয়তির নানা রূপ, ইতিহাস।

 

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top