ঢাকা শনিবার, ৮ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯

'আমূল বদলে যাবে কারাগার-আইজি প্রিজন্স

জামাল উদ্দিন | প্রকাশিত: ২২ মার্চ ২০২১ ২২:৫৫; আপডেট: ৮ অক্টোবর ২০২২ ০১:২৩

৫০ বছরে উন্নয়নের বাতাবরণে বাদ পড়েনি দেশের কারা বিভাগ। নানা সমস্যার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন এ অধিদফতর। কারাগার নয়, সংশোধনাগার হিসেবেই এটিকে পরিচিত করে তুলতে চায় সরকার। সেই লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান কারা অধিদফতরের আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন। সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটি কারাগার থাকবে না, সংশোধনাগার হবে। দুর্নীতিমুক্ত হবে। এমনটাই নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর।’ সাক্ষাৎকারে আইজি প্রিজন্স কারাগারে আসন্ন পরিবর্তনগুলো নিয়ে কথা বলেন।

‘ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি আমাদের। কারাগারগুলোর ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। অনেক কারাগার সংস্কার ও বর্ধিত করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে আটটি প্রকল্প চলছে। সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আরও ১৫টি কারাগার সংস্কার ও বর্ধিতকরণ প্রক্রিয়া পাইপলাইনে আছে।’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন আরও বলেন, ‘বিগত ২০০ বছরের ইতিহাস ছিল সকালে বন্দিরা নাশতা করতো রুটি আর গুড় দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এখন সপ্তাহে দু’দিন খিচুড়ি দেওয়া হচ্ছে। একদিন হালুয়া-রুটি আর চারদিন সবজি-রুটি। বন্দিদের জন্য উন্নত খাবারের ব্যবস্থাও ছিল না। এখন বিশেষ দিনগুলোতে উন্নত খাবারের জন্য বন্দিপ্রতি ১৫০ টাকা বরাদ্দ আছে।’
কারাগারে আটক বন্দিদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য শিক্ষকদের বেতন ছিল প্রতি পরিদর্শনে ২০ টাকা। তা বাড়িয়ে ২০০ টাকা করা হয়েছে। বন্দিদের ইফতারের জন্য বরাদ্দ ছিল সাত টাকা। সেটা এখন ৩০ টাকা। কারাগারের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মাসিক বরাদ্দ ছিল ২০ টাকা। সেটাও ৫০০ টাকা হয়েছে।

আইজি প্রিজন্স বলেন, ‘বন্দিদের জন্য আগে বালিশ ছিল না। এখন বালিশ দেওয়া হচ্ছে। কয়েদিরা ২৮টি কারাগারে ৩৮টি পণ্য উৎপাদন করে। এগুলো বিক্রির লভ্যাংশের ৫০ ভাগ বন্দিদের হিসাবে জমা হয়।’

তিনি বলেন, ‘কেরানীগঞ্জ, কাশিমপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটা কারাগারে ছোট গার্মেন্টসও আছে। এসবের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। ৩৮টি ট্রেডে আমরা বন্দিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। বন্দিদের মধ্যে অনেক উপকরণ আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে দিচ্ছি। যেমন, প্রশিক্ষিত বন্দিদের সমাজকল্যাণ অধিদফতরের সার্টিফিকেট ও উপকরণ দিচ্ছে। আহছানিয়া মিশনসহ অনেকে কাজ করছে। তারা প্রশিক্ষণ সামগ্রী দিচ্ছে।’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন বলেন, “আমরা যাতে আরও সুসংগঠিতভাবে কাজ করতে পারি সেই পরিকল্পনা আছে। প্রিজনারস অ্যাক্ট সংশোধন ও এর বাংলায় রূপান্তর করার কাজ চলছে। এর নাম দিচ্ছি ‘বাংলাদেশ প্রিজন্স অ্যান্ড কারেকশনাল সার্ভিস অ্যাক্ট’।”

বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা করা প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন বলেন, কিছু দিন করোনার জন্য সাক্ষাৎ বন্ধ ছিল। তখন টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ দিয়েছি। ‘স্বজন লিংক’ নামে একটা লিংকও চালু করেছি। যেটা দিয়ে সহজেই বন্দিরা কথা বলতে পারে। এ ব্যাপারেও একটা প্রকল্প নিচ্ছি। বন্দিরা যদি ভিডিও কনফারেন্স বা টেলিফোনের মাধ্যমে কথা বলতে চায়, সেটাও পারবে। এক্ষেত্রে অনেক স্বজনকে কারাগারে এসে সাক্ষাৎ করতে হবে না।’

বন্দিদের আইনি সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে প্যারা লিগ্যাল সার্ভিসের মাধ্যমে আইনি সহায়তা দিচ্ছি। যারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন তারা আমাদের এই সাপোর্ট দিচ্ছেন। সব কারাগারেই এই ব্যবস্থা চালু আছে।’

কারাগারে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে পদক্ষেপ কী নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে আইজি প্রিজন্স বলেন, ‘কারাগারে দুর্নীতি নেই, এটা অস্বীকার করবো না। আমরা নিজেরা সংশোধন হলে কারাগারকে সংশোধনাগার করতে পারবো। কারা অধিদফতরে যোগ দেওয়ার পর থেকে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কারারক্ষীদের সঙ্গে আলোচনা করছি। দুর্নীতি কেন হচ্ছে, সমস্যাটা কোথায়, সেটা বের করতে হবে।’

বন্দিদের চিকিৎসা নিয়ে জানতে চাইলে আইজি প্রিজন্স বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি কারাগারে হাসপাতাল আছে। কাশিমপুর কারাগারে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। তবে বড় সমস্যা জনবল। এটা ছাড়া সক্ষমতা ও পরিধি বাড়ালেও সুষ্ঠুভাবে কাজ করা কঠিন হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ১৪১ জন চিকিৎসক থাকার কথা। সেখানে আছে মাত্র সাত জন। করোনা পরিস্থিতির সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে ১০৫ জন চিকিৎসক ডেপুটেশনে সংযুক্ত করেছি। তাদের নিয়ে এখন ১১২ জন আছেন। এরা সবাই ইন-হাউজ নন। তাদের অনেকেই সিভিল সার্জন অফিস থেকে সকালে এসে ডিউটি করে বিকালে চলে যান। আমাদের যে প্রাধিকার আছে সেটাসহ যদি আমরা চিকিৎসক না রাখতে পারি, তাহলে বন্দিদের চিকিৎসা দেওয়া দুরূহ হয়ে পড়বে। আমাদের যে ডিপ্লোমা নার্স বা ফার্মাসিস্ট রয়েছেন সেখানেও ঘাটতি রয়েছে। এই জনবল জোগাতে না পারলে বন্দিদের প্রাপ্য সেবা দিতে পারবো না।’

শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গি বন্দিদের বিষয়ে আইজি প্রিজন্স বলেন, ‘জঙ্গিসহ যেসব বন্দি ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের আলাদা রাখার চেষ্টা করি। জায়গার সংকুলান না হলে গুরুত্ব বিবেচনা করে রাখার চেষ্টা করি। সুযোগ পেলে জঙ্গিরা অন্য বন্দিদের মোটিভেশনের চেষ্টা করে। সেজন্য আলাদা নজরদারি রয়েছে। পাশাপাশি তাদের সংশোধনের উদ্যোগও নিচ্ছি। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি নিয়মিত।’

আইজি প্রিজন্স বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব কিছু সাইকোলজিস্ট থাকার কথা। কারাগারে তাদের কাজ করার সুযোগ আছে। আমাদের অনেক জনবল প্রাধিকারভুক্ত। সেগুলো আমাদের নেই। এই জনবল খুবই জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি কারা গোয়েন্দা ইউনিট রয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। একইসঙ্গে অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি। তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করি। বিশেষ বন্দি যারা থাকে, তারা কাদের সঙ্গে দেখা করেন, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেন, সে খবরও রাখার চেষ্টা করি।’

‘কারারক্ষীদের দুর্নীতি আমরা কারা গোয়েন্দাদের মাধ্যমেই সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। তাই কারা গোয়েন্দা ইউনিটকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য তাদের আরও কীভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় সে চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের খুব ঘাটতি আছে। এটা করা হলে দুর্নীতি, অনিয়ম অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।’

কারাগারে গোপনে মোবাইল ব্যবহার ও মাদক সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাইলে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন বলেন, ‘এগুলো একদমই নেই, তা বলবো না। বন্দিরা যখন কারাগারের বাইরে আসা-যাওয়া করে, তখন তারা চেষ্টা করে নানাভাবে মোবাইল-মাদক নিয়ে আসার। চেষ্টা করছি যখন দর্শনার্থী আসে, তাদের জিনিসপত্র ভালোভাবে চেক করার। বিভিন্ন সময় আমরা তাৎক্ষণিক পরিদর্শনে গিয়ে মোবাইল উদ্ধার করি। এটা একটা চ্যালেঞ্জ বটে।’

বন্দিদের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের সুযোগ-সুবিধাগুলো বাস্তবায়নই দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে মনে করেন কারাগারের এই শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘সরকারের দেওয়া কোনও সুযোগ-সুবিধা থেকেই বন্দিদের বঞ্চিত করা যাবে না। সেটা বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।’

মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের কল্যাণে ডে-কেয়ার সেন্টার করার কথা জানিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন বলেন, ‘চেষ্টা করছি বন্দি মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের যাতে কোনও সমস্যা না হয়। শীতের সময়ে গরম কাপড় দেই। দুধের পরিমাণে ঘাটতি থাকে। সেটা পূরণে ক্যান্টিনের লভ্যাংশ থেকে এক্সট্রা দুধ দেওয়ার চেষ্টা করি। তারা যেন পড়াশোনার সুযোগ পায় সেজন্য শিক্ষকও রাখা হয়েছে।’




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top