ঢাকা সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ৩ কার্তিক ১৪২৮

এখন বাংলাদেশই উল্টো সহযোগিতার হাত বাড়ায়

শেখ শাহরিয়ার জামান, | প্রকাশিত: ২০ মার্চ ২০২১ ০০:২৪; আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২১ ১৭:৩২

স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের পথে। অর্থনীতিতে এখন পৃথিবীর প্রথম ৫০টি দেশের একটি আমরা। কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলাতেও প্রশংসা কুড়িয়েছি। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় ‘গ্রহণকারী দেশ তথা রেসিপিয়েন্ট কান্ট্রি থেকে বাংলাদেশ এখন অনেক দেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এ ছাড়া বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, অভিবাসনসহ আরো কয়েকটি বিষয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন  বলেন, ‘সম্প্রতি বিরাট পরিবর্তন দেখতে পাই। বেশ কয়েকটি বৈশ্বিক বিষয়ে আমরা নেতৃত্ব দিচ্ছি। এই নেতৃত্ব দানের পর্যায়ে আসতে অনেক সময় লেগেছে।’

 

জাতিসংঘে আমাদের অন্যতম বড় অবদান শান্তিরক্ষী বাহিনী। প্রথম দিকে আফ্রিকার একটি দেশ দিয়ে শুরু। পরে ধীরে ধীরে পেশাদারিত্ব, প্রতিশ্রুতি, প্রশিক্ষণ ও পারফরমেন্সের জন্য বেশ কয়েক বছর ধরে আমরা প্রথম বা দ্বিতীয় অবস্থানে আছি। এ মুহূর্তে আমাদের অবস্থান প্রথম।

 

তিনি বলেন, “এটি আমাদের ভাবমূর্তি তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতির যে আদর্শ-‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- এটিও আমাদের কাজে লেগেছিল।”

শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভালো অবস্থান সবাই স্বীকার করে নিয়েছে। গত ১০ বছরে পিস বিল্ডিং কমিশনের চেয়ারম্যান থেকে বিভিন্ন শান্তিরক্ষামূলক কাজে বাংলাদেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি নেতৃত্ব দানকারী দেশ বলে তিনি জানান।

শান্তি প্রতিষ্ঠার আরেকটি জায়গা হচ্ছে অস্ত্র নিরোধ (আমর্স ডিসআরমামেন্ট)। যেহেতু বাংলাদেশ একটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে, সেজন্য যুদ্ধের যে কষ্ট সেটার স্বাক্ষী আমরা। সেই হিসেবে জাতিসংঘের ডিসআরমামেন্ট বিভাগে বাংলাদেশের পদচারণা বেশ জোরালো ছিল।

অবস্থার পরিবর্তন

আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করা হতো। এখন বিশ্বের কোথাও দুর্যোগ হলে বাংলাদেশই উল্টো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।

সম্প্রতি কোভিড পরিস্থিতির সময় চীন, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশকে সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ। এর আগেও নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশ সাহায্য করেছে।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘আমরা এখন যা করছি সেটি বিছিন্নভাবে করছি। কিন্তু এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই। নিয়মিতভাবে স্বল্পোন্নত দেশ বা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে টেকনিক্যাল সহযোগিতার আওতায় আনতে পারি কিনা সেটার জন্য চেষ্টা করছি।’

এখন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে এবং এখানেও আমাদের কাজ করার সুযোগ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর বড় উদাহরণ হচ্ছে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন। এর অনেক সাফল্য আছে। যারা পিছিয়ে আছে তাদের যদি সরাসরি এর আওতায় আনতে পারি তবে অন্যদেশগুলোও উপকৃত হবে।’ এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দরকার বলে মনে করেন পররাষ্ট্রসচিব।

বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্যতে যে সাফল্য ও গবেষণা আছে সে বিষয়ে বিদেশিদের আমরা প্রশিক্ষণ দিতে পারি।

১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা অব্যহত রাখতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিতে পড়াশোনা করা পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন।

পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, মাতারবাড়ি, পায়রা বন্দর, বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পগুলো শেষ হলে সামগ্রিক একটা প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।

তিনি বলেন, ‘শুধু পদ্মা সেতু একাই মোট দেশজ উৎপাদনে দুই শতাংশ অবদান রাখবে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। সবগুলোর অবদান অংক কষে বের করা সম্ভব। তবে এর পরিমাণ দুই শতাংশের চেয়ে বেশেই হবে।’

১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কাল্পনিক কিছু না, এটি সম্ভব। এর জন্য মেগা প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলোর কারণেই মূলত আমাদের আউটলুকে পরিবর্তন হচ্ছে।’

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘আগে প্যারিস কনসোর্টিয়ামে যেতাম। দাতারা বলতো- এটা করেছো কিনা, ওটা করেছো কিনা। এখন তা হয় না। এখন আমাদের কিছু পয়েন্ট থাকবে, তাদের কিছু থাকবে। সমতার ভিত্তিতে আলোচনা হবে।’

বাণিজ্যে আমরা যে বাজার সুবিধা পাই সেটাও বদলে যাবে। এখন আমরা অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি, সামগ্রিক অর্থনৈতিক চুক্তি এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছি। শুধু ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি করেছি আমরা। কিন্তু আমাদেরকে জাপান, কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ানসহ অন্যান্য বড় শক্তির সঙ্গে এধরনের চুক্তি করতে হবে।

প্রতিযোগীদের অবস্থান

জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীবাংলাদেশের উন্নতিতে অন্য প্রতিযোগীরা খুশি হবে, বিষয়টি হয়তো সেরকম নয় বলে মনে করেন পররাষ্ট্রসচিব।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিযোগীরা আমাদের উন্নতি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করবে না। প্রতিযোগীরা হয়তো চেষ্টা করবে কিভাবে আমাদের নিচু করা যায় বা প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। এটি খুব স্বাভাবিক এবং এজন্য সতর্ক থাকতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘শ্রম-অধিকার, মানবাধিকারসহ অনেক চ্যালেঞ্জ আসবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো কিভাবে আমাদের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেটা দেখতে হবে।’

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, শিশু শ্রমিক নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। এখন সময় এসেছে নিজেদের উদ্যোগে এই তকমা থেকে মুক্ত হওয়ার। মানবপাচার নিয়েও আমরা বিব্রত হচ্ছি। এই বিষয়েও শক্ত অবস্থানে যাচ্ছি আমরা।

বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং

বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং-এর ক্ষেত্রে সরকারসহ সবার করণীয় আছে বলে মনে করেন মাসুদ বিন মোমেন।

তিনি বলেন, তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে একটা ব্র্যান্ডিং হয়েছিল। পরে বেশকিছু বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অবস্থা খারাপ হয়েছিল।

দেশের অনেক এনজিও এখনও দরিদ্র বাংলাদেশকে তুলে ধরে তহবিল সংগ্রহ করছে। এখানেও পরিবর্তনের সময় এসেছে বলে মনে করেন পররাষ্ট্রসচিব।

তিনি বলেন, ‘ন্যারাটিভ পরিবর্তন হতে সময় লাগবে। দুদর্শার চিত্র যত দেখানো যাবে তত হয়ত তাদের তহবিল পেতে সুবিধা হয়। তবে এখন বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনার বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ আছে তাদের।’




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top