ঢাকা বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮

‘রোজিনা ইসলাম ঠিক কাজটিই করেছেন’

নিজস্ব প্রতিবেদক: | প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২১ ১৮:১৯; আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২১ ০১:০৯

সংবাদ সংগ্রহের স্বার্থে সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম কোনও অন্যায় করেননি। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের কৌশল হিসেবে তিনি সঠিক দায়িত্বটিই পালন করেছেন। গণমাধ্যমকর্মীরা যেভাবেই সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রকাশ করবে, এটাই স্বাভাবিক। সত্য সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যমকর্মীর জন্য ‘তথ্য চুরি’ কোনও অন্যায়ের মধ্যে পড়ে না। অতীতেও এভাবে গণমাধ্যমকর্মীরা সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। ভবিষ্যতেও এ কৌশল থাকবে। অতীতে সচিবালয়সহ সরকারি দফতরে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন এমন কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এসব মন্তব্য করেন।

সংবাদ সংগ্রহকে কেন্দ্র করে রোজিনা ইসলামের সঙ্গে যা ঘটেছে তা নিন্দনীয় উল্লেখ করে তারা বলেন, সাংবাদিকরা দেশের জন্য কাজ করেন। কিন্তু আমলারা নিজেদের কালো অধ্যায় ঢেকে রাখতে গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ ভাবছেন। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে সাংবাদিকতা সংকুচিত হবে। জনগণ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হবেন।

 

দীর্ঘদিন ধরে সচিবালয় বিটে দায়িত্ব পালনকারী ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত  বলেন, ‘তথ্য চুরি’র যে অভিযোগ আনা হচ্ছে দেখতে হবে সেটা কী কারণে হয়েছে। প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা কাজটি করেছেন রিপোর্ট করার জন্য। সাংবাদিকতা করতে গেলে এরকম করতেই হবে। টুকটাক আমরাও করেছি। এটাকে চুরি বলা যাবে না। অন্যায় কাজ বলা যাবে না। এখানে উদ্দেশ্যটা গুরুত্বপূর্ণ। তার উদ্দেশ্য আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া ছিল না।

তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক বড় বড় সাংবাদিকতা হয়েছে এভাবেই। নিক্সনের ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ করেছিল ওয়াশিংটন পোস্ট। সেখানে কিন্তু পুরো তথ্য চুরি করেই সত্য উদঘাটন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য যদি সত্য উদঘাটন হয় তবে তা চুরি করা গ্রহণযোগ্য। এটা অন্যায় কিছু নয়।

সংবাদ’-এর সিনিয়র সাংবাদিক ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কাশেম হুমায়ুনও দীর্ঘদিন সচিবালয় বিটে রিপোর্টিং করেছেন। সরকারি অনেক গোপন তথ্য সংগ্রহ করে সাড়া জাগানো রিপোর্টও করেছেন মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকতা করার সময়।

রিপোর্টের তথ্য কেউ গোপনে সংগ্রহ করলেও শ্যামল দত্তের মতো সিনিয়র সাংবাদিকও সেটাকে অন্যায় বলতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘রোজিনা সাংবাদিকতাটাই করেছেন। তিনি তার কৌশল বা যোগ্যতা দিয়ে গোপন ফাইল সংগ্রহ করেছেন। কেবল রোজিনা নয়, সব সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব এটাই। গোপন বিষয় বের করে তারা নিউজ করবেন। তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা না পেলে তারা হান্টিং করার চেষ্টা করবেন। এটাই তো কোয়ালিটি সাংবাদিকতা। এখানে তো কোনও অন্যায় দেখছি না। সাংবাদিকতার প্রশ্নে এটাই এথিক্যাল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোন রিপোর্ট করবো, তার সংশ্লিষ্ট তথ্য আমি জোগাড় করবো। সেই রিপোর্ট করতে গিয়ে গোপন কোনও তথ্য থাকলে আমি সেটা বের করে আনবো। এটাই তো আমার যোগ্যতা।’

রাষ্ট্রীয় তথ্য রক্ষার দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা কী দায়িত্ব পালন করেছেন সেই প্রশ্ন রেখে কাশেম হুমায়ুন বলেন, রাষ্ট্রের দলিল চুরির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই দলিল হেফাজত করার দায়িত্ব কার? দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কেন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গোপন রাখতে পারলেন না? এর জন্য তো সবার আগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করা দরকার। রোজিনাকে কেন হেনস্তা করা হচ্ছে? কেউ যদি মনে করে এই তথ্যটা তার সিক্রেট রাখতে হবে সেটা তার রেসপনসিবিলিটি। এটা গোপন রাখা রোজিনা বা কোনও সাংবাদিকের কাজ নয়। রোজিনার দায়িত্ব ওই গোপন তথ্য প্রকাশ করা।

সাংবাদিকরা যেভাবে পারেন তথ্য সংগ্রহ করবেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনও রিপোর্টার তথ্য স্বাভাবিকভাবে না পেলে বিকল্প পন্থা অবলম্বন করবেনই। আমরাও এটা করেছি। অন্যরাও করবে। রোজিনা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গেছেন।

সিনিয়র সাংবাদিক আশিস সৈকত বলেন, আমরা দেশের স্বার্থ বিবেচনা করেই সংবাদ পরিবেশন করি। এই দায়িত্ববোধটা সব সাংবাদিকেরই রয়েছে। কিন্তু কিছু ব্যক্তির দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রকাশ তো দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়। বরং সেটা প্রকাশ না করাটাই দেশের স্বার্থবিরোধী।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, জনদুর্ভোগ নিয়ে রিপোর্ট করলে হয়তো সেটা পুলিশ, বিআরটিএ ও মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে যাবে। পক্ষান্তরে এটা তো জনগণের পক্ষে যাবে, দেশের পক্ষে যাবে। এতে মূল সমস্যাটা সরকারই জানতে পারবে না। সরকারের চোখ বন্ধ হয়ে যাবে।

রোজিনার ঘটনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার মনে হয়েছে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের বিষয়টি নিয়ে সরকারের হাইকমান্ডকে কেউ মিসগাইড করছেন। এটা তারা করছেন নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। তাদের দুর্নীতি প্রকাশ যাতে না পায় সেজন্য উচ্চপর্যায়কে তারা ভুল বোঝানোর চেষ্টা করছেন।

মাঠপর্যায়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় সম্পৃক্ত সাংবাদিক আশিস সচিবালয়, জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি দফতরের সংবাদ সংগ্রহের কাজ করেছেন। তিনি বলেন, যেকোনও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে গেলে ডকুমেন্ট লাগবে। সরকারি দফতরের অনুসন্ধানী রিপোর্ট হলে সরকারি দফতরেরই ডকুমেন্ট লাগবে। সেই ডকুমেন্ট কীভাবে বের করে আনতে হবে সেটা সাংবাদিকের যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। তার সোর্সের ওপর নির্ভর হবে। এই তথ্য সংগ্রহ যদি অপরাধ হয়, তবে আমরা সাংবাদিকরা প্রতিনিয়তই অপরাধ করছি।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সাবেক চিফ হুইপ খন্দকার দেলোয়ারের বিরুদ্ধে সংসদের ক্যান্টিন থেকে চাল-ডাল-তেল বাসায় নেওয়ার বিষয়ে রিপোর্ট করেছিলাম। ওই রিপোর্টের পর আমার বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার মানহানি মামলা হয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে ডকুমেন্ট ছিল বলেই মামলায় আমি জিতেছিলাম। রিপোর্টটি কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ব্যবহার করেছিল। কাজেই সরকারকে মনে করা উচিত গণমাধ্যম তাদের সাহায্যকারীর ভূমিকা পালন করছে। এই বিবেচনায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ না করে এতে বরং সরকারের উৎসাহিত করা উচিত।’

ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি ও জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক মাইনুল আলম বলেন, যে অভিযোগ দেখিয়ে রোজিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তা মুক্ত সাংবাদিকতায় একটি বড় বাধা। সরকারি দফতরের কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকর্মীদের কীভাবে দেখেন এটা তারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সচরাচর বাধার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু রোজিনার ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে তা অতীতে দেখা যায়নি। মনে হচ্ছে সাংবাদিকতা সংকুচিত হয়ে আসছে। এর নেপথ্যে সরকারেরই বানানো কিছু আইন কাজ করছে।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের আগের রিপোর্টগুলোর জন্য প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটা কেবল রোজিনার ওপর আঘাত নয়। গোটা সাংবাদিক সমাজের ওপর আঘাত।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top