ঢাকা শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮

মুরগি ব্যবসা থেকে ইয়াবার ‘গডফাদার’ মোস্তাক

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০২১ ০১:০৬; আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৭:০৮

মোস্তাক আহমদ ওরফে ইয়াবা মোস্তাক। কক্সবাজারের শীর্ষ ইয়াবা কারবারির তালিকায় রয়েছে তার নাম। ইয়াবা পাচার করে কামিয়েছে কোটি কোটি টাকা। বাড়ি, গাড়ি, জমিজমা, ব্যাংক ব্যালেন্সসহ গড়ে তুলেছে এক বিশাল সাম্রাজ্য। রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গড়ে তুলেছে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক। তার বিস্তৃত নেটওয়ার্কে পাচার হয়ে যাচ্ছে কোটি টাকার ইয়াবা। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেকবার তার বিস্তৃত নেটওয়ার্কে হানা দিলেও বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে ইয়াবা মোস্তাক। বুধবার (১০ মার্চ) র‌্যাবের এমনই এক অভিযানে ফসকে যায় ইয়াবা মোস্তাক।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা চোরাকারবারি ইয়াবা মোস্তাকের বাড়ি রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পূর্ব গোয়ালিয়াপালং এলাকায়। তার বাবা আশরাফ মিয়া পেশায় কাঠুরিয়া। কিন্তু এখন ইয়াবার কল্যাণে কাঠুরিয়া বাবার সংসারকে কোটিপতির কাতারে নিয়ে গেছে মোস্তাক। অল্প পড়াশোনা জানা মোস্তাক আনসার বাহিনীতে যোগ দেন প্রথম জীবনে। অল্প বেতনের কারণে আনসারের চাকরি ছেড়ে দেয় সে। বড় ভাই মনসুরের হাত ধরে মিয়ানমারের চোরাই পণ্যের ব্যবসা শুরু করে। মরিচ্যা বাজার একসময় ছিল চোরাই পণ্য পাচারের ঘাঁটি। চোরাই পথে কাপড়, আচার, বিয়ার, মদসহ নানা পণ্য নিয়ে আসে। সেখানেও তার ভাগ্য খোলেনি। পরে শুরু করে মুরগির ব্যবসা। এই মুরগি ব্যবসার আড়ালে দেশের বিভিন্ন স্থানে জড়িয়ে পড়ে ইয়াবা পাচারে। এক সময়ের মুরগির বিক্রেতা মোস্তাক এখন কোটি কোটি টাকার মালিক, গড়ে তুলেছে বিত্তবৈভব, গাড়ি, বাড়ি, ফিশিং বোটসহ আরও অঢেল সম্পদ। কোটি টাকা খরচ করে হয়েছেন জনপ্রতিনিধিও।

 

র‌্যাব সূত্র জানিয়েছেন, বুধবার রামুর খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় শীর্ষে থাকা ইয়াবা কারবারি মোস্তাকের একটি ইয়াবার চালান পাচার হচ্ছে এমন গোপন সংবাদে অভিযানে নামে র‌্যাব-১৫ একটি দল। এ সময় বরাবরের মতো অভিযানের খবরে পালিয়ে যান মোস্তাক।

 

গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক মিডিয়া আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী জানান, উদ্ধার হওয়া ২০ হাজার পিস ইয়াবার প্রকৃত মালিক মোস্তাক আহমদ ওরফে ইয়াবা মোস্তাক।

গ্রেফতারকৃত তিন সহযোগীকে নিয়ে ইয়াবা বিক্রি করতে ওইদিন স্থানীয় মরিচ্যা বাজার এলাকায় অবস্থান করেন তিনি। কিন্তু র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান মোস্তাক। র‌্যাবের কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী আরও জানান, মোস্তাক বড়মাপের ইয়াবা কারবারি। র‌্যাব সদস্যরা দীর্ঘদিন তাকে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ অদৃশ্য কারণে সে বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

উখিয়ার থানার ওসি (তদন্ত) সালাহ উদ্দিন জানান,  র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারকৃত তিন ইয়াবা কারবারিসহ মোস্তাকের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে।

উখিয়া ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোস্তাক আহমদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাকে ধরতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। অবশ্য, তাকে একদিন পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হবে।

রামু থানার ওসি কেএম আজমীরুজ্জামান বলেন, ‘মোস্তাক আহমদ একজন বড়মাপের ইয়াবা কারবারি। জনপ্রতিনিধির আড়ালে সে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবার বড় চালান পাচার করে আসছে। কিন্তু, হাতেনাতে প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা যাচ্ছে না। তার বিরুদ্ধে যেসব ইয়াবার মামলা রয়েছে, সবক’টিতে জামিনে রয়েছে। এমনকি আদালতের নির্দেশে তার বাড়ির ক্রোক করা মালামালও পুনরায় আদালতের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। এরপরও রামু থানা পুলিশ তাকে কড়া নজরদারিতে রেখেছে। অবশ্য কোনও না কোনও একদিন সে ধরা পড়বে। কারণ, সে একজন মুখোশধারী ইয়াবা কারবারি।’

যেভাবে ভাগিয়ে নেন জনপ্রতিনিধির পদ

বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী ইয়াবা মোস্তাকের পেছনে দৌড়ায় স্থানীয় ও জেলার বাঘাবাঘা জনপ্রতিনিধিরা। গত ইউপি নির্বাচনে তার ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড থেকে সদস্য পদে নির্বাচন করেন। তৎকালীন প্রশাসনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকে হাতে নিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাগিয়ে নেন ইউপি সদস্যের পদটি। এতেও তার শেষ আশ্রয় হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে সপরিবারে পালিয়ে যায় ঢাকায়। এ সময় ক্রসফায়ারের ভয়ে ঢাকায় ভাড়া বাসায় স্ত্রী-সন্তানদের রেখে ইয়াবা পাচারের একটি মামলায় আদালতে জামিন নিতে গিয়ে কারাগারে ঢুকে পড়ে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর গত বছরের ৩১ জুলাই টেকনাফে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা রাশেদ হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকটা নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে কারাগার থেকে বের হয়ে এলাকায় ফিরে আসে। পুনরায় বীরদর্পে চালিয় যায় ইয়াবার কারবার।

মোস্তাকের বিরুদ্ধে যত মামলা

মোস্তাক আহমদের বিরুদ্ধে রয়েছে দেড় ডজনেরও বেশি মামলা। তবে সব মামলায় জামিনে থেকে প্রকাশ্যে ঘুরছে এলাকায়। অংশ নিচ্ছে সভা-সমাবেশ ও ইউনিয়নের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। তবে কিছু দিন ইয়াবা পাচারে বন্ধ থাকলেও আবারও ফিরেছে কারবারে। স্থানীয় প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক নেতার ছত্রছায়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে ইয়াবার কারবারে। এখন প্রতি সপ্তাহে ইয়াবার চালান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

স্থানীয়ভাবে মোস্তাকের জনপ্রিয়তা

মোস্তাকের নির্বাচনি এলাকা রামুর খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডে তার বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। কয়েক বছর আগে তার বাড়ির পাশে মরিচ্যা গোয়ালিয়া খালের ধসে পড়া ব্রিজ তার অর্থায়নে মানুষের চলাচলের জন্য সংস্কার করে স্থানীয়দের নজর কাড়ে। শুধু ব্রিজ সংস্কার নয়, ধুরন্ধর এই ইয়াবা কারবারি এলাকার জনগণের মন জয় করার নানা কৌশল রপ্ত করেছে। অবশ্য টাকার কেরামতিতেই সব সম্ভব হয়েছে। গ্রামের প্রতিটি দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিয়ের দায়িত্বও নেন তিনি। তাদের বিয়েতে যত টাকা খরচ হয় সবই বহন করেন মোস্তাক। অনেককে নিজের টাকায় বিয়ে দিয়েছে। এ কারণে তার প্রতি সাধারণ মানুষের দরদ বেশি। আর সেটি কাজে লাগিয়েই তিনি এখন খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির তকমা লাগিয়ে নিষিদ্ধ ব্যবসার গুরুর আসনে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রমতে, ‘দীর্ঘ সময় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে স্থলপথে ইয়াবা পাচার করে এলেও গত কয়েক বছর ধরে সাগর পথকে নিরাপদ মনে করছে মোস্তাক। ইয়াবা বহনের জন্য মোস্তাকের রয়েছে একাধিক ফিশিং বোট। এসব ফিশিং বোট দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা বহন করে ইনানী সমুদ্র এলাকার রেজু খালের মোহনায় নিয়ে আসে। সেখানে ইয়াবাগুলো খালাস হয়ে তার বোনের জামাই সোনারপাড়া ঘাটঘর এলাকার ছুরুত আলমের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে মোস্তাকের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top